
একটি শহর কতটা আধুনিক, তার বিচার শুধু উড়ালসড়ক, উঁচু ভবন বা আলোকসজ্জা দিয়ে হয় না। প্রতিদিন রাস্তায় বের হওয়া মানুষ নিরাপদ, পরিষ্কার ও ব্যবহারযোগ্য একটি পাবলিক টয়লেট পাচ্ছেন কি না—এটিও নগর সভ্যতার মৌলিক পরীক্ষা। বাংলাদেশের বড় শহরগুলো সেই পরীক্ষায় এখনও সন্তোষজনক অবস্থায় নেই।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বরিশালের বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকা নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, জনসমাগমের তুলনায় পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা খুবই কম; যেগুলো আছে, সেগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই পরিচ্ছন্নতা, পানি, সাবান, নিরাপত্তা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। নারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন, আর প্রতিবন্ধী মানুষের উপযোগী সুবিধা অনেক জায়গায় প্রায় অনুপস্থিত। এটি কেবল অস্বস্তির সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, মর্যাদা ও নগরে সমান অংশগ্রহণের প্রশ্ন।
শহরে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাতায়াত করেন, বাজার করেন, গণপরিবহনের জন্য অপেক্ষা করেন, ফুটপাতে কাজ করেন কিংবা দূরপাল্লার যাত্রায় টার্মিনাল ব্যবহার করেন। অথচ এই বিশাল জনচলাচলের সঙ্গে স্যানিটেশন অবকাঠামোর পরিকল্পনা তাল মিলিয়ে বাড়েনি। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগেন নারী, শিশু, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, পথচারী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা। অনেকেই বাধ্য হয়ে পানি কম পান করেন বা দীর্ঘ সময় শারীরিক প্রয়োজন চেপে রাখেন—যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সমস্যার সমাধান শুধু আরও কিছু ভবন নির্মাণ নয়। প্রথম কাজ হওয়া উচিত নগরভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি—কোথায় কত মানুষ চলাচল করেন, কোথায় কী সুবিধা আছে এবং কোথায় সবচেয়ে বড় ঘাটতি। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, বড় বাজার, হাসপাতাল এলাকা, পার্ক, পর্যটনকেন্দ্র ও ব্যস্ত বাণিজ্যিক অঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুবিধা বাড়াতে হবে। প্রতিটি স্থাপনায় নারী-পুরুষের প্রয়োজন, প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশগম্যতা, আলো, নিরাপত্তা, পানি, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা এবং শিশু পরিচর্যার প্রয়োজন বিবেচনায় নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নির্মাণের চেয়ে রক্ষণাবেক্ষনের দায়বদ্ধতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্ব কোন সংস্থার, দিনে কতবার পরিষ্কার হবে, পানি বা আলো বন্ধ থাকলে কত সময়ের মধ্যে ঠিক করতে হবে—এসব সেবামান প্রকাশ্য হওয়া দরকার। বেসরকারি অপারেটরকে দায়িত্ব দেওয়া হলে চুক্তির মানদণ্ড ও তদারকি স্পষ্ট হতে হবে। নাগরিক অভিযোগের জন্য সহজ নম্বর বা ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং সেবার অবস্থা নিয়ে প্রকাশ্য ড্যাশবোর্ডও কার্যকর হতে পারে।
তৃতীয়ত, পাবলিক টয়লেটকে ‘অতিরিক্ত সুবিধা’ হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে। নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন ও স্যানিটেশন জনস্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি শহর যখন লক্ষ মানুষের শ্রম ও চলাচলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তখন তাদের মৌলিক শারীরিক প্রয়োজনের জন্য ন্যূনতম অবকাঠামো নিশ্চিত করা দয়া নয়—এটি নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব।
বাংলাদেশের শহরগুলো দ্রুত বড় হচ্ছে। এখনই পরিকল্পিত স্যানিটেশন নেটওয়ার্ক গড়ে না তুললে জনসংখ্যা ও চলাচল বাড়ার সঙ্গে সংকট আরও গভীর হবে। উন্নয়নকে দৃশ্যমান প্রকল্পের বাইরে এনে মানুষের দৈনন্দিন মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করার সময় এসেছে। একটি পরিষ্কার, নিরাপদ ও সবার ব্যবহারযোগ্য পাবলিক টয়লেট ছোট অবকাঠামো হতে পারে, কিন্তু তা নাগরিক জীবনের মান সম্পর্কে বড় কথা বলে।
সম্পাদকীয় প্রেক্ষিত: দেশের চার মহানগরে পাবলিক স্যানিটেশন সুবিধার ঘাটতি নিয়ে সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন ও জনস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত উদ্বেগ।