পানির মানুষ
- আপডেট সময় রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- ২১ বার দেখা হয়েছে

জুমার নামাজের আগে বাংলা বয়ানটুকু আজমল সাহেব সাধারণত পান না। তিনি মসজিদে ঢোকেন খতিব মিম্বরে ওঠার পর, যখন সামনের কাতারগুলো ভরে গেছে এবং পেছনের দিকে বসতে গিয়ে কারও হাঁটু, কারও টুপির উপর পা ফেলতে হয়, পাশের জনকে অনুরোধ করতে হয় একটু জায়গা করে দেওয়ার। সেদিন একটু আগে দোকান বন্ধ করতে পেরেছিলেন বলে মসজিদে গিয়ে প্রথম কাতার পেয়ে গেলেন।
তিনি শুনলেন, ইমাম সাহেব সুরা নাহলের একটি আয়াতের শেষাংশ পড়ছেন, “ওয়া ইয়াখলুকু মা লা তা’লামুন। তিনি এমন সৃষ্টিও করেন, যাদের কথা তোমরা জানো না।”
এরপর কথায় কথায় আদমের মাটি, জিনের আগুন আর ফেরেশতার নূরের প্রসঙ্গ এল। ইবলিস আগুনকে মাটির চেয়ে উত্তম ভেবে অহংকার করেছিল—ইমাম সাহেব বোঝালেন, সৃষ্টির উপাদান দিয়ে মর্যাদা মাপাই ছিল তার প্রথম ভুল। বয়ান এগিয়ে গেল অহংকারের লক্ষণ, প্রতিবেশীর হক ও দেনা পরিশোধের দিকে; কিন্তু আজমল সাহেব বাঁধা পড়লেন মাটি, আগুন আর নূরের সাথে।
নামাজ শেষে তিনি জুতার তাকে ভিড় কমার অপেক্ষা করলেন। ইমাম সাহেব বেরোতেই কাছে গিয়ে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “হুজুর, পানির তৈরি কোনো জাতি কি থাকতে পারে?”
ইমাম সাহেব প্রথমে ভেবেছিলেন, লোকটি হয়তো মাসআলা জানতে এসেছে। প্রশ্ন শুনে চশমার ওপর দিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, “কুরআনে তো প্রাণবান সবকিছুকে পানি থেকে সৃষ্টির কথাই আছে। ওইটা অবশ্য নুতফা, মানে বীর্য অর্থে।”
“আমি সে অর্থে বলছি না। মানুষকে যেমন মাটির আর জিনকে আগুনের তৈরি বলা হয়—তেমন আলাদা কোনো জাতি, যাদের মূল স্বভাবই পানির মতো।”
ইমাম সাহেব চশমার ওপর দিয়ে তার দিকে তাকালেন। “তার কথা আমাদের জানানো হয়নি। কিন্তু জানানো হয়নি বলেই যে নেই, সেটাও বলা যায় না।”
“কিন্তু কিতাবে তাদের কথা নেই কেন?” প্রশ্নটা আজমল সাহেব করলেন। করার পর বুঝলেন প্রশ্নটা না করলেও চলত, কারণ এর উত্তর তিনি নিজেও জানেন। কিতাব তো সৃষ্টিজগতের তালিকা নয়। মানুষের হেদায়াতের জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকুই এসেছে। ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার নামও আলাদা করে পান না, তাই বলে ওগুলো নেই?
ইমাম সাহেব একটু হেসে উত্তর দিলেন, “আল্লাহর সৃষ্টিরহস্য নিয়ে চিন্তাফিকির করা ভালো। অজানাকে নিয়ে ভাববেন, তবে ঘোষণা দেবেন না।”
আজমল সাহেব রাস্তায় বেরিয়ে দেখলেন, দুপুরের রোদে পিচ নরম হয়ে আছে। তার মনে হলো, পানির তৈরি কোনো জাতি থাকলে তাদের চেনা কঠিন হওয়ারই কথা। মাটির মানুষ তো গায়ে মাটি মেখে ঘোরে না, আগুনের তৈরি জিনকেও উনুনের শিখার মতো দেখা যায় না। পানির মানুষেরা হয়তো মানুষের আকারেই থাকে।
আচ্ছা, তারা কি খায়? অথবা, তারা কী খায়? হয়তো সকলের সঙ্গে একই থালায় বসে, অথচ খাবারের চেয়ে গ্লাসের দিকে হাত বাড়ায় বেশি। তাদেরও কি নবী এসেছেন, কোনো কিতাব আছে? সে কিতাব কি শুকনো অবস্থায় সাদা থাকে, পানির ছোঁয়া পেলে অক্ষর ফুটে ওঠে? তাদের মৃত্যু হলে মাটির নিচে রাখা হয়, না কি কোনো নদী নিঃশব্দে তাদের ফিরিয়ে নেয়? এসবের কোনো উত্তর তার জানা নেই। কিন্তু অজানা একটি জাতির কথা ভাবতে ভাবতে তার মনে পড়ল আকিল সাহেবের কথা।
আকিল সাহেব তিন বছর তার নিচতলার ভাড়াটে ছিলেন। চাকরি থাকতে মাসের পাঁচ তারিখের মধ্যে ভাড়া দিয়ে দিতেন। একবার আজমল সাহেবের ছোট ছেলে গভীর রাতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়লে আকিল সাহেবই হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। রক্তের দরকার হলে নিজের পরিচিতদের ফোন করেছিলেন। ফেরার পথে ওষুধের টাকাও দিয়েছিলেন। বাড়ির পানির পাম্প নষ্ট হলে অন্য ভাড়াটেরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে অভিযোগ করেছিল, আকিল সাহেব কোমরসমান ট্যাংকে নেমে মিস্ত্রির সঙ্গে পাইপ ধরেছিলেন।
তারপর যে প্রতিষ্ঠানে তিনি হিসাবের কাজ করতেন সেটি বন্ধ হয়ে গেল। প্রথম মাসে ভাড়ার অর্ধেক দিলেন, দ্বিতীয় মাসে কিছুই পারলেন না।
তৃতীয় মাসের সাত তারিখে আজমল সাহেব তার দরজায় গিয়ে বলেছিলেন, “আমার বাড়ি দাতব্য প্রতিষ্ঠান না, আকিল সাহেব। সাত দিনের মধ্যে ঘরটা খালি করতে হচ্ছে আপনাকে।”
যদিও অন্যান্য সময় তিনি তাকে আকিল ভাই বলে সম্বোধন করতেন।
আকিল সাহেব বলেছিলেন, “আর একটা মাস সময় দিলে চাকরিটা—”
আজমল সাহেব মনে মনে ঠিক করে রাখা অযুহাতটি খাড়া করেছিলেন, “আমার দোকানটাও ভালো যাচ্ছে না, আকিল সাহেব। আপনি তো জানেন, ছেলেটার পড়াশোনার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় লাখ লাখ টাকা পাঠাতে হচ্ছে। আপনি কষ্ট নিয়েন না, খুঁজলে ঠিকই অন্য একটা বাসা পেয়ে যাবেন।”
তিনি আর বলেননি তার এক কর্পোরেট বন্ধু তার বসের জন্য দেড়্গুণ বেশি ভাড়ায় আজমল সাহেবের বাসার লোকেশনে একটা ফ্লাট দেখে দিতে বলেছেন, সেটা আজমল সাহেবের নিজের বাসা হলে নাকি সবচেয়ে ভালো হয়।
কথাটি শুনে আকিল সাহেবের মুখে সেদিন অদ্ভুত একটা পরিবর্তন হয়েছিল। চোখের কোণে পানি জমেছিল, মুখের স্বচ্ছ বাদামি রংটি যেন হঠাৎ ঘোলা হয়ে গিয়েছিল। তিনি আর অনুরোধ করেননি। সাত দিনের মাথায় স্ত্রী ও একটি লোহার ট্রাঙ্ক নিয়ে চলে গিয়েছিলেন।
তার প্রায় ছয় মাস পরে ওষুধের দোকানে দেখা। আজমল সাহেব মানিব্যাগ আনেননি, ফোনেও টাকা পাঠানো যাচ্ছিল না। কাউন্টারের পাশে দাঁড়ানো আকিল সাহেব কোনো কথা না বলে তার ওষুধের বারোশো টাকা মিটিয়ে দিয়েছিলেন।
আজমল সাহেব অস্বস্তিতে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমার ওপর আপনার রাগ নেই তো, ভাই?”
আকিল সাহেব হেসেছিলেন। “রাগ করে কী হবে? ভাড়াটা তো সত্যিই দিতে পারিনি।”
সেদিন বাড়ি ফিরে আজমল সাহেব টাকাটা পাঠিয়েছিলেন কি না, এখন আর নিশ্চিত মনে করতে পারলেন না। শুধু মনে পড়ল, গরমের মধ্যেও টাকা দেওয়ার সময় আকিলের আঙুল তার হাতে লেগেছিল বরফের মতো ঠান্ডা।
পরদিন তিনি আকিলের পুরোনো কর্মস্থলে গেলেন। কাচের সাইনবোর্ডটি নেই, ঘরটিতে এখন প্লাস্টিকের চেয়ার বিক্রি হয়। পাশের চায়ের দোকানি আকিল সাহেবকে চিনল।
বলল, “বড় মাটির মানুষ আছিল। তিন মাসের বেতন মাইরা দিল মালিক, তাও গলা উঁচু করে নাই।”
ঠিকানা পেলেন সাবেক দারোয়ানের কাছে। যাওয়ার আগে পুরোনো মালিকের নম্বরও নিলেন। ফোনে সেই ব্যক্তি আকিলের প্রশংসাই করলেন—হিসাবে ভুল করতেন না, বেশি কথা বলতেন না, প্রতিষ্ঠান বন্ধের সময় অন্যরা পাওনার জন্য শ্রম অফিসে গেলেও তিনি অর্ধেক টাকা নিয়ে সই করে দিয়েছিলেন।
শেষে বললেন, “এমন মাটির মানুষ এখন পাওয়া যায় না।”
আজমল সাহেব ফোন রেখে হিসাব করলেন, লোকটির কাছে আকিলের তখনো দুই মাসের বেতন পাওনা।
পুরোনো বাসার পাশের আমেনা খালার কাছেও গেলেন তিনি। পানি সরবরাহ বন্ধ থাকলে আকিল সাহেব ভোরে দূরের চাপকল থেকে দুই হাতে বালতি টেনে আনতেন। নিজের ঘরে এক বালতি রেখে বাকি পানি বৃদ্ধা ও ওপরতলার পরিবারকে দিয়ে দিতেন।
আমেনা খালাও বললেন, “এমন মাটির মানুষ আর হয় না, বাবা। একবার আমার ছেলেটা রাগ করে ধাক্কা দিয়েছিল, উলটা ও-ই ক্ষমা চাইছে—বলছে, দরজার সামনে দাঁড়ানো তার ঠিক হয় নাই।”
“ধাক্কা খেয়ে উনি পড়ে যাননি?”
“‘পড়ছিল তো। তবে অদ্ভুতভাবে। মানুষ পড়লে হাত-পা ছড়ায়। উনি এমনভাবে পড়ল, লাগে কী মেঝেতে কেউ পানি ঢালল। পরে আবার উঠে দাঁড়াল।” আমেনা খালা কথাটি বলেই হাসলেন।
আকিল সাহেব এখন শহরের শেষ মাথায় এক সরু গলিতে থাকেন। গলির মুখের মুদি দোকানে নাম বলতেই দোকানি চিনে ফেলল। “ওই যে ঠান্ডা হাতের লোকটা? ভালো মানুষ। নিজের জিনিস চাইতে পারে না। লাইনে পেছনে দাঁড়াইলে সবাই সামনে ঢুইকা যায়।”
দোতলার টিনছাওয়া ঘরে ওঠার সিঁড়িতে আজমল সাহেবের সঙ্গে বাড়িওয়ালার দেখা হলো। লোকটি আকিল সাহেবকে ডাকতে ডাকতে বলছিল, “ভালো মানুষ দিয়া আমার কী লাভ? মাস গেলে ভাড়া লাগে।” কথাটি শুনে আজমল সাহেবের মনে হলো, নিজেরই কণ্ঠ অন্য একজনের গলা ধার করে কথা বলছে।
আকিল সাহেব দরজা খুললেন। ভাদ্রের বিকেল, টিনের নিচে ঘর আগুনের মতো গরম; অথচ করমর্দনে তার হাত আগের মতোই ঠান্ডা। কপাল, গলা, জামার বুক ঘামে ভেজা—যেন শরীরের ভেতরের বরফ চুপচাপ গলছে। ঘরে দুটি গ্লাস, অর্ধেক রুটি এবং পানিতে ভরা একটি সাদা বাটি ছাড়া খাবার বলতে কিছু চোখে পড়ল না। তাকের ওপর নীল কাপড়ে মোড়ানো পাতলা একটা বই। কাপড়টি শুকনো, কিন্তু তার নিচের কাঠে গোল ভেজা দাগ।
“ভাবি কোথায়?” আজমল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
“বাপের বাড়ি। এখানে গরম বেশি।”
“আপনি খান কী?”
আকিল সাহেব প্রশ্নটা বুঝতে না পেরে সাদা বাটির দিকে তাকালেন, তারপর হাসলেন। “যা পাওয়া যায়।”
“ওটা কিসের বই?”
আকিল সাহেব তাকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাড়ির পুরোনো বই।”
আজমল সাহেবের মাথায় যে প্রশ্নটি এলো সেটি তিনি করার সাহস করলেন না। তিনি ওষুধের টাকার কথা তুললে আকিল সাহেব বললেন, “ওটা তো পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।”
“দিয়েছিলাম?”
“না দিলেও অসুবিধা ছিল না।”
ঠিক তখন বাড়িওয়ালা দরজায় এসে দাঁড়াল। ভাড়ার কথা বলতেই আকিলের মুখের ওপর যেন হালকা ছায়া পড়ল। এক মুহূর্তে চোখ-মুখ ঘোলা হয়ে আবার পরিষ্কার হলো।
তিনি বললেন, “কাল দিয়ে দেব।”
লোকটি চলে গেলে আজমল সাহেবও উঠে দাঁড়ালেন। তিনি সঙ্গে আনা খামে কয়েক মাসের ভাড়ার সমান টাকা রেখে বললেন, ‘এটা ধার না। আপনার মতো মানুষকে চিনতে না পারার কাফফারা।”
আকিল সাহেব খামটি নিতে চাইলেন না। আজমল সাহেব জোর করে বললেন, “আমারে আদায় করতে দেন, ভাইজান। নাইলে আমি শান্তি পাব না।”
তার শান্তির কথা ভেবেই যেন আকিল সাহেব এবার প্যাকেটটি রাখলেন। নিজের অনিচ্ছাটুকু সরিয়ে অন্যের ইচ্ছাকে আবারো জায়গা দেওয়া। তার চোখের কোণে স্বচ্ছ পানি জমল। নিচে নামার সময় আজমল সাহেবের মনে হলো, মানুষ তাকে ভুল করে ‘মাটির মানুষ’ বলছে, আসলে কথাটি হবে ‘পানির মানুষ’।
বাড়ি ফিরে তিনি প্রথমবার ঘরটাকে বাইরের একজনের মতো দেখতে পেলেন। বসার ঘরের পর্দা তার পছন্দের খয়েরি, দেয়ালের রং তার পছন্দের মেটে, টেলিভিশনে তার খবরের চ্যানেল চলছে। খাবার টেবিলে করলা ভাজি, ছোট মাছের ঝোল ও পাতলা ডাল—তিনটিই তার পছন্দের। তার স্ত্রী সালেহা কখনো করলা খান কি না, তেত্রিশ বছরের সংসারে তিনি জানেন না।
দেয়ালে ছেলেমেয়েদের শৈশবের কয়েকটি ছবি ঝুলছে। প্রতিটি ছবিতে সালেহা কারও না কারও দিকে সামান্য হেলে আছেন—কখনো কাঁদতে থাকা শিশুর দিকে, কখনো শাশুড়ির হুইলচেয়ারের পেছনে, কখনো আজমল সাহেবের কাঁধের সঙ্গে নিজের কাঁধ মিলিয়ে। তার একার কোনো ছবি নেই। আজমল সাহেবের মনে হলো, এই সংসারে সবাই নিজের আকারটি অক্ষত রেখেছে; শুধু সালেহা প্রত্যেকের প্রয়োজনমতো একটু একটু করে বেঁকেছেন।
সালেহা বেগম রান্নাঘর থেকে ভাত আনছিলেন। আজমল সাহেব লক্ষ করলেন, চুলার তাপে তার কপাল ভিজে গেছে, ঘাড় বেয়ে ঘাম নামছে। বাটিটা নিতে গিয়ে হাত ছুঁতেই চমকে উঠলেন—হাতটি ঠান্ডা। শুধু ঠান্ডা নয়, অস্বাভাবিক নরম; চাপ দিলে যেন আঙুল বসে যাবে।
“তোমার শরীর খারাপ?” আজমল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
“না তো।”
“এত ঘামছ কেন?”
সালেহা আঁচলে কপাল মুছে বললেন, “গরম।”
ডালে লবণ কম হয়েছিল। অন্যদিনের অভ্যাসে আজমল সাহেব বলে ফেললেন, “এত বছরেও আন্দাজ হলো না?”
পরক্ষণেই দাঁত দিয়ে জিভ কাটলেন তিনি, ধীরে ধীরে সালেহার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তার চোখের চারপাশের রং ঘোলা হয়ে উঠেছে, যেন পরিষ্কার পানিতে এক চিমটি মাটি পড়েছে। তিনি লবণের পাত্র এগিয়ে দিয়ে বললেন, “আরেকটু দিয়ে নাও।”
আজমল সাহেবের ক্ষুধা চলে গেল। তবু তিনি আর খানিকটা খেয়ে খাওয়া পর্ব দ্রুত শেষ করে সালেহাকে একে একে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন, “তোমার প্রিয় খাবার কী?”
সালেহা ভেবে বললেন, “তুমি যা খাও।”
“তোমার কোন রং ভালো লাগে?”
“তোমার তো নীল ভালো লাগে।” সালেহা বললেন।
“গান? কোথাও বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে? প্রিয় ঋতু শীত না বর্ষা?”
প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে তিনি ক্রম-ক্রমান্তরে আবিষ্কার করতে থাকলেন, এই সংসারে সালেহা থেকেও নেই। সালেহার তা-ই ভালো লাগে যা আসলে আজমল সাহেবের পছন্দ।
তিনি গলায় আরো অধিক কোমলতা ঢেলে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নিজের কী ভালো লাগে, সালেহা?”
সালেহা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন। জানালার বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে মুখ খুললেন সালেহা তিনি খুব আস্তে বললেন, ‘মনে নাই।’
আজমল সাহেবের মনে পড়ল, বিয়ের প্রথম বছর সালেহা একবার সমুদ্র দেখতে যেতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সমুদ্র দেখে কী হবে, সেই টাকায় ঘরের জন্য আলমারি কেনা ভালো। তারপর আলমারি হয়েছে, খাট হয়েছে, তিনতলা বাড়ি হয়েছে; সমুদ্র আর হয়নি।
এতকাল তিনি স্ত্রীর শান্ত স্বভাবের প্রশংসা করেছেন আত্মীয়দের কাছে, “আমার বউ মাটির মানুষ, কোনো কিছু নিয়ে জেদ নেই।”
বৃষ্টির ছাঁট মেঝেতে পড়ছিল। সালেহা জানালা বন্ধ করতে উঠলে তিনি বললেন, “থাক না সালেহা, যদি তোমার ভালো লাগে।”
সালেহা বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকালেন। তারপর বহুদিন পর এমন একটি বাক্য বললেন, যার ভেতরে আজমল সাহেবের কোনো অংশ নেই, “আচ্ছা, খোলা থাক তাহলে। বৃষ্টির গন্ধ আমার ভালোই লাগে। হিহি!” কিশোরীর মতো করে হাসলেন সালেহা বেগম।
তিনি স্ত্রীর কাছে গিয়ে খুব সাবধানে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। সালেহার শরীর সঙ্গে সঙ্গে তার বুক ও দুই বাহুর আকার নিয়ে নিল; এত নিখুঁতভাবে, যেন সারা জীবন এই একটি পাত্রের জন্যই অপেক্ষা করছিল। ছেড়ে দেওয়ার পরও কাঁধের কাছে তার আঙুলের পাঁচটি মৃদু চাপ কিছুক্ষণ থেকে গেল। তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
আজমল সাহেব লক্ষ্য করলেন, তার স্ত্রী হঠাৎ প্রগলভ হয়ে উঠেছেন। ঝর্ণাধারার মতো অনর্গল কথা বলতে শুরু করেছেন সালেহা। শুনতে শুনতে আজমল সাহেবের ভেতরটা নরম হয়ে আসছে, কাদার মতো।






