
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বাংলাদেশের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এদিনে প্রতিটি ভোটার বসবে এক একটি বিচারকের আসনে। তার বিচার-বিবেচনা ও সমর্থনে নির্বাচিত হবে দেশ পরিচালনার প্রতিনিধি। রায়/ভোট কোনো অসৎ ও অযোগ্য প্রার্থীর পক্ষে পড়লেই দেশ ও মানুষের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। অতএব আমার আপনার মতো এক একজন ভোটারের ভূমিকা কত গুরুত্বপূর্ণ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবুও বলতে হচ্ছে কারণ ভোটপ্রার্থীরা নানা কৌশল অবলম্বন করছেন যাতে ভোটার নামক বিচারকের রায়/সমর্থন আনতে পারেন তাঁর দিকে। এমতাবস্থায় সঠিক তথ্য গোপন, নানামুখী অপপ্রচার, রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপ এমনকি ভোটারের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থের কারণে যদি কোনো অযোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হয় তবে সবাইকে দুর্ভোগে পড়তে হবে প্রার্থী জয়ী হওয়ার পর থেকেই। তখন জনসেবার পরিবর্তে জনপ্রতিনিধির অত্যাচারে অতিষ্ঠ জনগণ মুক্তির পথ খুঁজতে বাধ্য হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত এ দুর্ভোগের জন্য বিজয়ী জনপ্রতিনিধির সাথে ভোটার নিজেও দায়ী থাকবে। কারণ তাকে ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি করা হয়েছে। ভোটপ্রার্থী চাপাবাজ, ধান্দাবাজ, চান্দাবাজ, মাদকব্যবসায়ী, ঋণখেলাপি, ভূমিদস্যু, ধর্মব্যবসায়ী ইত্যাদি দোষে দুষ্ট নাকি প্রকৃতপক্ষে সৎ, আমানতদার, জনগণের সেবক, মানবতাবাদী, দেশপ্রেমিক ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত তা যাচাই-বাছাই না করেই ভোট দেওয়া হয়েছে। এমনকি অতি সামান্য কোনো স্বার্থের বিনিময়ে হলেও নিজের মূল্যবান ভোট দিয়ে তাকে প্রতিনিধি করা হয়েছে। তাই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যদি কোনো অন্যায় করে তবে তার দায় সেসব ভোটারদেরকেও নিতে হবে যারা তাকে নির্বাচিত করেছে। নির্বাচিত প্রতিনিধির ভালো কাজে যদি তার ভোটার প্রশংসা করে, গর্ব করে বলে যে তাকে আমরা ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করিয়েছিলাম তবে তার দায়ভার সেসব ভোটারের নয় কেন যারা ভোট দিয়ে একজন মন্দ প্রতিনিধি নির্বাচিত করে?
দায়িত্ব যখন ভালো জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার তখন দায় এড়িয়ে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একটি নির্বাচনে একটি ভোট মানে একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করা দেশ পরিচালনার জন্য, সমাজ পরিবর্তনের জন্য, মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য। কিন্তু দুর্ভাগা জাতি আমরা এই অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজে অজ্ঞতা, অদক্ষতা, অবহেলা এমনকি স্বার্থপরতার পরিচয় দিই প্রায় ক্ষেত্রেই। দলীয় মনোনয়ন থেকে শুরু করে জনগণের ভোট—সব ক্ষেত্রেই স্বার্থপরতা। একটি দল কোনো অযোগ্য ব্যক্তিকে যদি মনোনয়ন দিয়েও থাকে তবে জনগণের উচিত হচ্ছে তাকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা। এতে প্রার্থী পরাজিত হওয়ায় দলেরও একটা উচিত শিক্ষা হবে ভালো প্রার্থীকে মনোনয়ন না দেওয়ার কারণে। কিন্তু ভোটের সময় প্রায় ভোটারই ব্যক্তির চেয়ে দলের প্রাধান্য বেশি দিয়ে থাকে। একটি দলের নীতি-আদর্শ থাকে কিতাবে আর ব্যক্তির বা দলীয় ব্যক্তির নীতি-আদর্শ থাকে প্রকাশ্যে, বাইরে। তারপরেও কি দলীয় অন্ধ বিশ্বাস থেকে ভোট? যে ভোটার তার নিজ এলাকার একজন প্রার্থী সম্পর্কে তেমন অবগত না সে ঐ প্রার্থীর দল সম্পর্কে কতটুকুই বা জানে? দলের মনোনীত ব্যক্তি/প্রার্থীর অবস্থা সম্পর্কে অবগত না হয়েও দলের প্রতি অনুগত হয়ে একজন অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে সমর্থন করা আবেগ ছাড়া আর কিছুই না। আবেগ দিয়ে দেশ চলে না। তাই আবেগ নয় বরং বিবেক দিয়ে বিবেচনা করে উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচন করা প্রতিটি ভোটারের নৈতিক দায়িত্ব।
বিবেক দিয়ে বিবেচনা করতে গেলে নিজেকে বিচারকের আসনে বসিয়ে ন্যায়সঙ্গতভাবে ভোট দিতে হবে। আমরা নিজেরা ন্যায়সঙ্গত উপায়ে ভোট না দিয়ে জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে ন্যায়পরায়ণতা আশা করি কীভাবে? আমাদের কর্ম (ভোট) যেমন হবে ফলও তেমন হবে। তাই ভবিষ্যতের কষ্ট লাঘব করতে হলে আগে কষ্ট করে ভোটপ্রার্থীদের চরিত্র সম্পর্কে জানা দরকার। খুব বেশি জানা সম্ভব না হলেও যতটুকু জানা যাবে সে বিবেচনায় অন্তত মন্দের ভালোটাকে ভোট দিয়ে নিজেকে বোঝানো যাবে যে, জেনে-বুঝে ভালো প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ভোট দেওয়া কোনো উৎসব না যে সেখানে আনন্দ আহ্লাদ করতে যাওয়া হয়। বরং ভোট একটি পরীক্ষা যাকে বলা হতে পারে অগ্নিপরীক্ষা। অনেকগুলো প্রতিনিধির মধ্যে সৎ যোগ্য উপযুক্ত প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করানোর পরীক্ষা। এই বিবেচনাবোধ থেকে ভোটারের ঘুম আসার কথা না পরীক্ষার আগের রাতের পরীক্ষার্থীর মতো। কারণ একজন ভোটারের মূল্যবান ভোটে যদি কোনো চাপাবাজ, ধান্দাবাজ, চান্দাবাজ, চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসীর গডফাদার ইত্যাদির মতো কোনো অসৎ, অযোগ্য ও অনুপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচিত হয় তবে তার দায় ভোটার এড়াতে পারে না। কেউ যদি কোনো চোরাকারবারি বা মাদক ব্যবসায়ীকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করায় আর এতে করে সমাজে চোরাকারবারি বা মাদকের ভয়াবহতা বেড়ে যায় তবে তার দায় ভোটারকে নিতেই হবে। এই দায় এড়ানোর একটাই উপায় তা হলো কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে এবং কোনো স্বার্থের বিনিময়ে নিজে বিক্রি না হয়ে ভোটের সময় নিজের দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দিয়ে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করা।
স্বার্থের কাছে বিক্রি হয়ে নিজের মূল্যবান ভোট কোনো অপাত্রে দেওয়া ভালো প্রার্থী নির্বাচনে অন্তরায়। একটি বিড়ি, এক কাপ চা, এক খিলি পান, টাকার একটি চকচকে নোট, প্রতিপক্ষ কোনো ব্যক্তিকে শায়েস্তা করানো, অন্যায়ভাবে কাউকে হেনস্থা করানো, নিজের পক্ষে কোনো বেআইনি রায় আনানো, অবৈধ কোনো দখলদারিত্ব বাড়ানো এমনকি নেতার সাথে একটা সেলফির বিনিময়ে হলেও নিজের বিবেক বিসর্জন দিয়ে ভোট দেওয়া হয় তার পছন্দের প্রার্থীকে যদিও প্রার্থী নানা দোষে দুষ্ট থাকে। এরকম ভোটারের কাছে ভোটের সময় যেন ধান্দা কামানোর ব্যবসা-মৌসুম। ভুলে গেলে চলবে না যে, ভোটারের পেছনে অবৈধভাবে যে প্রার্থী যত টাকা ব্যয় করছে সে জয়ী হলে সুদে-আসলে উঠিয়ে নেবে তার চেয়ে বেশি। ছোট মাছের লোভে কারেন্ট জাল ব্যবহারকারীরা ভবিষ্যতে বড় মাছ পাবে না; কোনো ভোটার এই সাধারণ বিষয়টা বুঝতে না পারলে ভবিষ্যতে তার জন্য দুর্ভোগ। যে সমস্ত ভোটাররা সামান্য স্বার্থের কাছে বিক্রি হয়ে ভোট দেয় কোনো অযোগ্য অপদার্থ দুর্নীতিবাজকে তারা দেশ জাতি ও মানবতার শত্রু। এলাকায় একটা মসজিদ, একটা মন্দির, খেলার মাঠ এমনকি হিজড়াদের একটা অফিস করে দেওয়ার কথা শুনলেই উক্ত এলাকার/গোত্রের লোকজন দলে দলে তাকে ভোট দেয়। মানে যে যত লোভ দেখাবে তাকে তত ভোট দেওয়া হবে। কী আশ্চর্য আমাদের প্রতিশ্রুতি আর চাওয়া-পাওয়া! এরকম কোনো প্রলোভন বা প্রতিশ্রুতি নয় বরং নৈতিক দায়িত্বসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করলে তার নীতি-নৈতিকতাই তাকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের কাজ করাতে বাধ্য করবে। ভোটাররা অনেক সময় এ ধারণা থেকেও ভোট দেয় যে, অমুক দল এবার সরকার গঠন করবে তাই সে দলের প্রার্থীকেই ভোট দিতে হবে। আসলে ভালো প্রতিনিধি নির্বাচনে এ ধারণাও বিশেষ এক অন্তরায়। জনপ্রতিনিধি হিসেবে একজন সৎ, ন্যায়পরায়ণ, মানবতাবাদী যোগ্য মানুষ যদি বিরোধী দলেরও হয়, যদি স্বতন্ত্র থেকেও বিজয়ী হয় তবুও সংসদে গিয়ে সে জনগণের পক্ষে কথা বলবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করে তেলবাজ দালালদের মতো জি হুজুর মিউজিকের মিউ মিউ না করে সিংহের মতো গর্জন করবে। ‘আমার ভোট আমি দেব যাকে খুশি তাকে দেব’ নয় বরং আমার ভোট আমি দেব, দেখে-শুনে-বুঝে দেব, দেশ ও মানুষের কল্যাণে অংশ নেব।