
২০২৫ সাল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ইতিহাসে সাফল্যের পাশাপাশি গভীর বেদনার এক অধ্যায় হয়ে থাকবে। এক বছরের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয় হারিয়েছে সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তাদের—যাঁদের মৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে রেখে গেছে অপূরণীয় শূন্যতা।
কিছু মানুষ চলে গেলেও তাঁদের উপস্থিতি রয়ে যায় ক্লাসরুমের স্মৃতিতে, করিডরের নীরবতায়, সহপাঠী ও সহকর্মীদের হৃদয়ের গভীরে। নামগুলো আর রেজিস্টারে ওঠে না, কণ্ঠগুলো আর শোনা যায় না; তবু স্মৃতি হয়ে তারা প্রতিদিন ফিরে আসে। সময় এগিয়ে গেলেও কিছু ক্ষতি কোনোদিনই সময় পূরণ করতে পারে না।
২০২৫ সাল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ঠিক তেমনই এক বেদনাবিধুর বছর। সাফল্য ও অগ্রগতির আড়ালে এই বছরটি বহন করেছে গভীর শোকের ভার। এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয় হারিয়েছে তার কয়েকজন শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাকে—যাঁদের অনুপস্থিতি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং প্রতিটি একটি গল্প, একটি স্বপ্ন, একটি জীবনের অসমাপ্ত অধ্যায়।
আইন বিভাগের ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তিন্নী আক্তারের জীবন ছিল ধৈর্য ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘদিন ফুসফুসজনিত রোগে ভোগার পর ব্লাড ইনফেকশনের জটিলতায় আক্রান্ত হন তিনি। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় তাঁর মৃত্যু হয়। নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার এই শিক্ষার্থীর মৃত্যু আইন বিভাগজুড়ে শোকের ছায়া নামিয়ে আনে। শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে তিন্নী আজও দৃঢ়চেতা ও অদম্য মনোবলের প্রতীক।
২০২৫ সালের সবচেয়ে নাড়া দেওয়া ঘটনাগুলোর একটি ছিল লোক প্রশাসন বিভাগের ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আফরিনের মৃত্যু। ৮ সেপ্টেম্বর সকালে কুমিল্লার কালিয়াজুরী এলাকায় নিজ ভাড়া বাসা থেকে সুমাইয়া ও তাঁর মায়ের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিনই মোবারক হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আদালতে আসামির স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে ‘ধর্ষণের পর হত্যা’র নির্মম বাস্তবতা। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবার নয়, স্তব্ধ করে দেয় পুরো বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি দেশকেও।
বছরের শেষ প্রান্তে এসে কুবি হারায় আরেকটি সম্ভাবনাময় মুখ। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাসমানিয়া রহমান প্রভা দীর্ঘদিন ধরে ব্লাড ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। বন্ধু, পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত ১৯ নভেম্বর রাত সাড়ে ১২টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। চাঁদপুরের বাগাদী এলাকার এই শিক্ষার্থীর অসমাপ্ত স্বপ্ন আজও সহপাঠীদের চোখে জল হয়ে ফিরে আসে।
২০২৫ সালের একেবারে শেষ প্রান্তে প্রশাসনিক অঙ্গনেও নেমে আসে শোকের ছায়া। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব দপ্তরের হিসাব কর্মকর্তা দুলাল চন্দ্র ঘোষ অসুস্থতাজনিত কারণে ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গভীর শোক প্রকাশ করে।