
মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে পালিত সর্বজনবিদিত ধর্মীয় উৎসব শবে বরাত হিজরি ক্যালেন্ডারের শাবান মাসের ১৪ তারিখ রাতে বিশেষ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ফজিলতপূর্ণ রাত হিসেবে বিবেচিত এই দিবসটি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বতন্ত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। এই বিশেষ পালনরীতির স্বীকৃতি হিসেবে গত ১২ অক্টোবর ২০২৪ শবে বরাতকে জাতীয় অধরা (বিমূর্ত) সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর।
বিশেষভাবে পুরান ঢাকায় শবে বরাতের বর্ণাঢ্য ও ঐতিহ্যবাহী উদযাপনরীতিকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের হেরিটেজ হাবের জাতীয় ইনভেন্টরির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে দেশে জাতীয় অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২১টিতে। জাতীয় ইনভেন্টরিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করেন বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকৌশলী তাসরুজ্জামান বাবু। এর মধ্য দিয়ে শবে বরাতের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মূর্ত ও বিমূর্ত ক্যাটাগরিতে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নির্বাচন করে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় ছয়টি ঐতিহ্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এগুলো হলো— বাউল সংগীত (২০০৮), জামদানি বুননের ঐতিহ্যবাহী শিল্প (২০১৩), পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা (২০১৬), সিলেটের শীতলপাটি বুননের ঐতিহ্যবাহী শিল্প (২০১৭), ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্র (২০২৩) এবং টাঙ্গাইলের শাড়ি বুননের ঐতিহ্যবাহী শিল্প (২০২৫)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শবে বরাত আন্তর্জাতিক অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বাংলাদেশে রিলিজিয়াস ট্যুরিজমের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে, যা থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
শবে বরাতের ইতিহাস নিয়ে গবেষকদের মধ্যে রয়েছে ভিন্নমত। গবেষক খাজা শামসুদ্দিন মিরার মতে, ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে শবে বরাত পালিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম মনে করেন, অষ্টম শতাব্দীতে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু ও মুলতান বিজয়ের পর এ অঞ্চলে শবে বরাত পালনের প্রচলন শুরু হয়।
এ বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে শবে বরাতকে জাতীয় অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকরণের আবেদক তাসরুজ্জামান বাবু জানান, লালমনিরহাটে সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগে নির্মিত সাহাবিদের মসজিদের নিদর্শন পাওয়া গেছে। পাশাপাশি আনুমানিক ৬১৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বন্দরে সাহাবিদের আগমনের ইতিহাসও সুবিদিত। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা যায়, বাংলাদেশে সপ্তম শতাব্দী থেকেই শবে বরাত পালিত হয়ে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রাচীনত্বের কারণেই নয়, বরং এমন আড়ম্বরপূর্ণ ও সাংস্কৃতিক আমেজঘন শবে বরাত উদযাপন কেবল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানেই দেখা যায়; এমনকি আরব বিশ্বেও এ ধরনের উদযাপন প্রচলিত নয়। বাংলাদেশে শবে বরাত উপলক্ষে নফল রোজা ও ইবাদতের পাশাপাশি হালুয়া-রুটি বিতরণ, বুট-সুজি-গাজর ইত্যাদির হালুয়া প্রস্তুত, গোশত-রুটি খাওয়া, মসজিদ ও মাজারে আলোকসজ্জা, মিলাদ-মোনাজাত-রাত্রিজাগরণ-কবর জিয়ারত এবং তবারক বিতরণের মাধ্যমে দিনটি উদযাপিত হয়। নবাবদের আমল থেকেই পুরান ঢাকার নারিন্দা, লক্ষ্মীবাজার, রায় সাহেব বাজার, চকবাজার, লালবাগ, গেণ্ডারিয়া, আরমানিটোলা, সুত্রাপুরসহ নানা জায়গায় শবে বরাত উপলক্ষে বিক্রি করা হয় ঐতিহ্যবাহী ফেন্সি রুটি ও শিরমাল রুটি। সময়ের ব্যবধানে এদেশে শবে বরাতের আয়োজন কিছুটা ফিকে হয়ে গেলেও সেখানকার বড় বড় বেকারিগুলো, যেমন আনন্দ বেকারি, আল রাজ্জাক কনফেকশনারি আজও ধরে রেখেছে ঐতিহ্য। ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুনের মতে, পুরান ঢাকার নবাবরাই শবে বরাতের উদযাপনকে একটি স্বতন্ত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ দেন।
শবে বরাতকে ইউনেস্কোভুক্ত আন্তর্জাতিক অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে চলতি বছরের মার্চ মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে। এ বিষয়ে সরকার কতটা আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল।