
হঠাৎ করে মুখ একদিকে বেঁকে যাওয়া, এক পাশের চোখ ঠিকমতো বন্ধ না হওয়া কিংবা কুলি করার সময় পানি মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া—এসব লক্ষণ দেখা দিলে বুঝতে হবে মুখের স্নায়ুতে সমস্যা হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় বেলস পালসি বা ফেসিয়াল পালসি।
মানুষের মুখের অভিব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করে সপ্তম ক্রেনিয়াল নার্ভ, যা পরিচিত ফেসিয়াল নার্ভ নামে। এই নার্ভ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে গেলে মুখের এক পাশ দুর্বল হয়ে পড়ে। তখনই দেখা দেয় ফেসিয়াল পালসি।
প্রথমবার রোগটি শনাক্ত করেছিলেন জন বেল নামের একজন চিকিৎসক, তাই একে অনেক সময় বেলস পালসি নামেও ডাকা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে এ সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
ফেসিয়াল পালসি হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে, যেমন—
ভাইরাল সংক্রমণ
মধ্যকর্ণের ইনফেকশন
ঠান্ডা লাগা
মাথায় আঘাত
স্ট্রোক
টিউমার
কানের অস্ত্রোপচারে নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
এসব কারণে মুখের স্নায়ু আক্রান্ত হলে মুখ বাঁকা হয়ে যেতে পারে।
ফেসিয়াল পালসির সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
মুখ একদিকে বেঁকে যাওয়া
আক্রান্ত পাশের চোখ বন্ধ না হওয়া
চোখ দিয়ে পানি পড়া
কুলি করলে পানি মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া
খাবার গিলতে অসুবিধা
কপালে ভাঁজ করতে না পারা
কথা জড়িয়ে যাওয়া
চিকিৎসক সাধারণত রোগীর ইতিহাস এবং স্নায়ু পরীক্ষা করেই প্রাথমিকভাবে রোগ শনাক্ত করতে পারেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বড় কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না।
তবে প্রয়োজনে করা হতে পারে—
রক্ত পরীক্ষা (CBC, ESR)
সুগার পরীক্ষা
ফেসিয়াল নার্ভ এনসিভি (NCV)
এক্স-রে বা অন্যান্য স্ক্যান
বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি, কারণ চিকিৎসায় স্টেরয়েড প্রয়োগে সুগার বেড়ে যেতে পারে।
ফেসিয়াল পালসির চিকিৎসা শুরু হয় মূল কারণ অনুযায়ী। যেমন—
ভাইরাসজনিত হলে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ
প্রদাহ কমাতে স্টেরয়েড
স্ট্রোক হলে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা
এর পাশাপাশি দ্রুত সুস্থতার জন্য ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার মধ্যে থাকতে পারে—
ফেসিয়াল মাসল এক্সারসাইজ
ইনফ্রারেড থেরাপি
ইলেকট্রিক্যাল স্টিমুলেশন
স্পিচ রি-এডুকেশন
ব্যালুনিং ও রিঙ্কলিং এক্সারসাইজ
প্রোপ্রাইওসেপ্টিভ নিউরো মাসকুলার ফ্যাসিলিটেশন
চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়—
ঠান্ডা পরিবেশ এড়িয়ে চলা
আইসক্রিম বা অতিরিক্ত ঠান্ডা খাবার না খাওয়া
বাইরে গেলে সানগ্লাস ব্যবহার করা
রাতে ঘুমানোর সময় আক্রান্ত চোখ ঢেকে রাখা
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়া
হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া অবহেলা করার মতো বিষয় নয়। দ্রুত চিকিৎসা ও নিয়মিত ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে বেশির ভাগ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। তাই লক্ষণ দেখা দিলেই দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।