
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক ধরনের অলিখিত কূটনৈতিক রেওয়াজ ছিল—ফল ঘোষণার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানান। মনমোহন সিং থেকে নরেন্দ্র মোদী—দিল্লির নেতৃত্ব বদলালেও এই ধারায় ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এবারের প্রেক্ষাপট আলাদা। টানা চারবার জয়ের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ভোটে অংশই নেয়নি, আর বিজয়ের পর মোদী সরাসরি বিএনপির নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
শুক্রবার সকাল ৯টার পর মোদী এক্স-এ পোস্ট করে ‘সংসদীয় নির্বাচনে নির্ণায়ক জয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার’ জন্য তারেক রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান। আধঘণ্টা পর একই বার্তা বাংলাতেও প্রকাশ করেন। শুধু তাই নয়, তিনি সরাসরি ফোনেও কথা বলেন তারেক রহমানের সঙ্গে। যে নেতার প্রতি দিল্লি এক সময় দৃশ্যত শীতল ছিল, তার প্রতিই এমন উন্মুক্ত বার্তা—পর্যবেক্ষকদের ভাষায় এটি নিঃসন্দেহে এক ‘ডিপ্লোম্যাটিক ইউ-টার্ন’।
দিল্লির কূটনৈতিক মহলের অভিমত, বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী বিএনপি সরকারই ভারতের জন্য ‘সেরা বাজি’। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি কার্যত ‘অটোমেটিক চয়েস’ হয়ে উঠেছে। ফলে সম্পর্ক পুনর্গঠনে সময় নষ্ট করতে চায়নি দিল্লি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট আশ্বাস দিয়েছে। অতীতে বিএনপি আমলে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক ওঠানামা করলেও এখন ভারত পুরনো হিসাব না কষে ভবিষ্যতের সমীকরণে নজর দিচ্ছে।
২০১৪ সালে বিজেপি প্রথমবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলে, লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার উদ্যোগ নেন। প্রধানমন্ত্রী মোদীর জন্য প্রীতি উপহার পাঠানো হয়, যা পৌঁছে দেন বিজেপির নেতা বিজয় জলি। তবু সে সময় দিল্লির তরফে দৃশ্যমান সাড়া মেলেনি।
ঢাকায় ভারতের সাবেক হাই কমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তীর মতে, সে সময়কার রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও গোয়েন্দা মূল্যায়ন সম্পর্ক গড়ার পথে বাধা ছিল। প্রকাশ্যে না হলেও ‘ট্র্যাক টু’ পর্যায়ে যোগাযোগ চলত—দিল্লি, এমনকি ব্যাংককেও বৈঠক হয়েছে বলে তিনি জানান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ক্ষমতার নাটকীয় পরিবর্তনের পর দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আসে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি-ই হয়ে ওঠে ভারতের প্রধান কৌশলগত অংশীদার। দিল্লির মনোহর পারিক্কর আইডিএসএ-র সিনিয়র ফেলো স্ম্রুতি পট্টনায়ক মনে করেন, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রশ্নে নতুন সরকার কড়া অবস্থান নেবে—এমন সম্ভাবনা কম। ফলে বড় কোনো কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি আপাতত দেখছে না ভারত।
তবে সব ইস্যুতে দিল্লি ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ দিচ্ছে না। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ইঙ্গিত দিয়েছেন—প্রতিটি বিষয় আলাদা করে দেখা হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রশ্নে বিজেপি নেতৃত্ব প্রকাশ্যেই কড়া অবস্থান নিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, যে সরকারই আসুক—সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ না হলে সম্পর্ক সহজ হবে না। যদিও দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার নতুন নেতৃত্বকে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বরণ করছে।
এক যুগের শীতলতা কাটিয়ে তারেক রহমানের প্রতি মোদীর উষ্ণ অভিনন্দন কেবল সৌজন্য বার্তা নয়—এটি কৌশলগত বাস্তবতার প্রতিফলন। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক মানচিত্রে দিল্লি দ্রুত অবস্থান নিয়েছে। তবে এই উষ্ণতার স্থায়িত্ব নির্ভর করবে প্রতিশ্রুতি, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং দ্বিপাক্ষিক আস্থার ওপর।