
শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ঢাকার কাছে নরসিংদীতে অনুভূত ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প দেশজুড়ে সতর্কতার ঘণঘণ্টা বয়ে এনেছে। বিশেষজ্ঞরা এটিকে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ফোরশক বা পূর্বসংকেত হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশে প্রায় এক শতাব্দীতে বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প হয়নি। তবে ভূমিকম্পপ্রবণ এ অঞ্চলের ইতিহাস বলছে, বড় দুর্যোগের আগে ছোট বা মাঝারি কম্পন দেখা যায়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, “ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প ১০০–১২৫ বছর পরপর এবং ৮ মাত্রার ভূমিকম্প ২৫০–৩০০ বছর পরপর ঘটতে পারে। ১৯৩০ সালের পর বড় ভূমিকম্প না হওয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে।”
তিনি আরও জানান, অতীতে এ অঞ্চলে ভয়াবহ কম্পন ঘটেছে, যেমন:
১৮৯৭ সালের গ্রেট ইন্ডিয়ান (অ্যাসাম) ভূমিকম্প (ম্যাগনিচুড ৮.২–৮.৩)
এমনকি আরও প্রাচীন বিশাল ভূমিকম্পের মধ্যে রয়েছে ১৭৬২ আরাকান ভূমিকম্প, যা ম্যাগনিচুড ৮.৫–৮.৮ ছিল।
এই ভূমিকম্পের ইতিহাস ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলছে, ভূ-তাত্ত্বিক ফোল্ট — বিশেষ করে ডাউকি ফল্ট — একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপর্যায়।
বাংলাদেশে সংকেত পাওয়া যায় এমন প্লেট ও ফল্ট লাইনগুলোর কারণে ভূমিকম্পপূর্ণ সক্রিয়তা রয়েছে, যেমন নর্দান ও পূর্বাঞ্চলে প্লেট বাউন্ডারি, মধুপুর ফল্ট ও ডাউকি ফল্ট।
ভূমিকম্পের স্থায়িত্ব ছিল প্রায় ২০ সেকেন্ড। ঢাকার বিভিন্ন ভবনে ফাটল দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিল্ডিং কোড না মানার কারণে অনেক ভবন দুর্বল হয়ে গেছে।
অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, “ঢাকা শহরে প্রায় ২১ লাখ ভবন রয়েছে। রানা প্লাজা ধসের পর বারবার বলার পরও অনেক ভবনের পরীক্ষা হয়নি। জরুরি ভিত্তিতে ভবনগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত (সবুজ), সংস্কারযোগ্য (হলুদ) এবং ঝুঁকিপূর্ণ (লাল) হিসেবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।”
তিনি আরও সতর্ক করলেন, “ঢাকার ১০০ কিমির মধ্যে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ১–৩ লাখ মানুষ হতাহত হতে পারে এবং প্রায় ৩৫ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে।”
বাংলাদেশ ইন্দো-এউরেশিয়ান এবং ভারতীয় প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত, এবং এই ভৌগলিক অবস্থান দেশকে ভূকম্পন ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
সরকারি ও বৈজ্ঞানিক জরিপ বলেছে, দেশে ডাউকি ফল্ট এবং মধুপুর ফল্ট রয়েছে, যা ইতিহাসে বড় ভূমিকম্পের উৎস হিসেবে কাজ করেছে।
জাতীয় নীতি নথিতেও (যেমন জাতীয় বহু-জোখিম পরিকল্পনা ও ভবন কোড) ভূমিকম্প ঝুঁকিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
এই ৫.৭ মাত্রার কম্পনকে বিশেষজ্ঞরা শুধু একটা ছোট কম্পন হিসেবে নিচ্ছেন না; বরং তারা এটিকে যেমন ভবিষ্যতের বড় ভূমিকম্পের উত্তরাধিকারী সংকেত হিসেবে দেখছেন। ইতিহাস, ভূতাত্ত্বিক অবস্থান এবং দেশভরভূমিকম্প ঝুঁকি বিশ্লেষণ একসাথে বলে দিচ্ছে — এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া না হলে বড় বিপর্যয় ঘনিয়ে আসতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান রুবাইয়াত কবির জানান, বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান ও ইউরোশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ফলে এখানে সময়মতো কমমাত্রার কম্পন হয়।
তিনি বলেন, “ডিজিটাল পদ্ধতিতে ২০০৭ সাল থেকে পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর ঢাকার আশপাশে ৫.৭ মাত্রার কম্পন এবারই প্রথম।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বড় ভূমিকম্পের পর সাধারণত পরাঘাত বা আফটারশক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে এখন পর্যন্ত তা ঘটেনি।