
ভারতীয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী মোদী সরকারের গদি টলিয়ে দিয়েছিল। তার নির্মিত মোদী সরকারের দুর্নীতিবিরোধী কন্টেন্টগুলো জনমত তৈরিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং এই কারণে বিজেপি অনেকগুলো আসন হারায়, সেই গল্প আপনাদের অজানা নয়।
ধ্রুব রাঠী নির্বাচনের পরে একটা উক্তি করেছিলেন, Never underestimate the power of a common man। আমার মনে হয় পিনাকী-ইলিয়াস প্রমুখ ইউটিউবারদের সংঘবদ্ধ জোট বাংলাদেশের ধ্রুব রাঠী হওয়ারই স্বপ্ন দেখেছিল। হয়ত নির্বাচনের ফলাফল উলটো হলে তারাও এমন কিছু লিখে ফেসবুকে পোস্ট দিত।
কিন্তু তাদের সঙ্গে ধ্রুব রাঠীর পার্থক্য কোথায় জানেন? সততা বনাম শঠতা।
ধ্রুব রাঠী শুরু থেকেই যে ফ্যানবেজ তৈরি করেছিল তারা তার পরিচয় জানত। তিনি কাউকে ধোঁকা দেননি, আর তাঁর কন্টেন্টগুলোও গুজব ছিল না, ছিল ফ্যাক্ট। তাই তার ভিডিওতে জনমতে ব্যপক প্রভাব পড়েছিল।
এর বিপরীতে পিনাকী-ইলিয়াস বিগত সরকারের ১৭ বছরের অন্যায়-অবিচার নিয়ে যখন কন্টেন্ট বানানো শুরু করে তখন তাদের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা তৈরি হয়। যেহেতু এগুলো সৎ ছিল, তাই এগুলোর গ্রহণযোগ্যতাও ছিল। কিছু অতিরিক্ত সুশীল ছাড়া দলীয়-নির্দলীয় সব ধরণের মানুষই তাদেরকে গ্রহণ করে ফেলে। সেই সময় তাদের জনপ্রিয়তা এতই বেশি ছিল যে দেশে আসলে হয়ত বিমানবন্দরে তাদের স্বাগত জানানোর জন্য ধুন্ধুমার কান্ড বেধে যেত! সেই সময় যদি তারা বলে দিত যে তারা কোনো বিশেষ দল এর তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করে তাহলে হয়ত তাদের ফ্যানবেজ কম হত কিন্তু যেটা হত সেটা প্রকৃত হত। কিন্তু সেই সময় তারা হয়ত সত্যি নির্দলীয় ছিল, অথবা সব মানুষের সাপোর্ট পেতে নির্দলীয় থাকার ভান করে ছিল। তারা একদিকে জিয়ার কথা বলত, বিএনপির প্রশংসা করত, খালেদার প্রশংসা করত, প্রথম বাংলাদেশ গান চালিয়ে দিত, তারেক এর প্রতি নির্যাতনের কথা বলত, বিএনপির সাধারণ সমর্থকদের মাঠের ভেতর মশারী টেনে রাত কাটানোর গল্প বলত, অপরদিকে জামাত-শিবিরের উপর হওয়া ভয়াবহ নির্যাতনের কথা বলত বলে সবাই তাদেরকে আপন ভাবত।
কিন্তু কোন কুক্ষণে যে তারা হাসিনা সরকারের পতনের পর একটা নির্দিষ্ট দলের পারপাস সার্ভ করতে গেল? তাদের উচিত ছিল ইউনুস সরকারের সমালোচনা করে সরকারকে লাইনের উপর রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা, আর কোনো বিশেষ দলের সমর্থক না হয়ে উভয় দলেরই ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা করা, উভয় দলকেই সতর্ক করা। কিন্তু এই চমৎকার কাজটি না করে তারা দেশের সবচেয়ে বড় দলটিকে ব্যাশিং করতে নেমে পড়ল। এবং সবচেয়ে বড় কথা, মিথ্যা ও অপতথ্যের উপর ভিত্তি করে তারা এই কাজগুলো করতে লাগল। নিজেদের সাময়িক অর্জিত সাফল্য ও ক্ষমতায় বিমোহিত হয়ে তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করা শুরু করল। একে-ওকে হুমকি, এর-ওর চরিত্রহনন, মববাজি, গুজব ছড়ানো ইত্যাদিকে তারা কর্ম হিসেবে বেছে নিল। ফলে বড় দলটির বিপুল সংখ্যক কর্মী, এবং কিছু সাধারণ চিন্তাশীল দর্শক নিজেদের প্রতারিত অনুভব করল এবং তাদের প্রতি নিজেদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিল।
মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উলটাপালটা বয়ান নির্মাণ, আরো কিছু দেশপ্রেমী এক্টিভিস্ট ও জার্নালিস্ট যারা একসময় তাদেরই সহযোদ্ধা ছিল তাদেরকে ব্যাশিং করে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে তারা একঘরে হয়ে গেল। যদিও এর ফলে তারা বিপরীত দলটির একেবারে কোলে ঠাঁই পেয়ে গেল।
উল্লেখ্য, তারা যে দলকে সমর্থন করে সেই দলটির প্রধানকে কিন্তু ঘৃণা করে না, অথচ ঘৃণা করে পিনাকী-ইলিয়াস প্রমুখকে। কারণ তারা ব্যাশিং করে, মিথ্যা গুজব ছড়ায়, মিথ্যা ন্যারেটিভ তৈরি করে। এই কাজটা ধ্রুব রাঠী করেনি বিধায় তাকে লজ্জিত হতে হয়নি।
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে পিনাকী-ইলিয়াস প্রমুখদের তৈরিকৃত মিথ্যা বাবলে ঐ দলের কর্মীরা এমনভাবে ঢুকে পড়েছিল যে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরও বাবল ছিন্ন করে বের হয়ে আসতেই পারছে না। আর নির্লজ্জ মিথ্যাচারকরণ, অন্যের সম্মানহরণ, ঔদ্ধত্য-অহঙ্কারে নিমজ্জন প্রভৃতি নানা পাপ সাধন করার ফলে পিনাকী-ইলিয়াসকে পুরো জাতির সামনে লজ্জিত হতে হলো।
ধরুন, এখন যদি তারা দেশে আসার কথা ভাবে, আগের সেই জনভালোবাসা কি পাবে মনে হয়? জনগণের ভালোবাসা এমনই এক রাজমুকুট যা বহু রাজাও লাভ করতে পারে না। নির্ভেজাল অন্তর যখন কলুষিত হয়ে যায় তখন আল্লাহ তাআলা এই মহান দৌলত কেড়ে নেন। এর আগেও অনেকেই এরকম পা ফস্কেছেন, আপনারা তাদের চেনেন।
পিনাকী-ইলিয়াসের আর ধ্রুব রাঠী হয়ে ওঠা হলো না। শঠতা দিয়ে সততার সাথে লং রানে টেকা যায় না। তবে এটা নিয়ে একটা এনালাইসিস হতে পারে যে প্রায় সব বড় ইউটিউবারের একটি বিশেষ দলকে সমর্থন দেওয়ার কারণ কী? এর পেছনে ভিন্ন কিছু ছিল কিনা তা বের করা গেলে তা একটা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কেসস্টাডি হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যেন কখনো অলাদ্দোয়াল্লিন না বানান। আমিন।