
শুধু দীর্ঘ কারাবাস নয়; প্রহসনের বিচারে মৃত্যুদণ্ড। তবুও নির্বাচনী মঞ্চে দাঁড়ালেন তারা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন বিএনপি নেতা মো. লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু এবং জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম, যারা গণঅভ্যুত্থানের আগে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. লুৎফুজ্জামান বাবর এবং সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। বাবরকে ২০০৭ সালে গ্রেফতার করা হয়, এবং একদিনের জন্যও জামিন মেলেনি। তিনি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন দীর্ঘ ১৮ বছর। পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে মলিন মুখে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য ছিল চিরচেনা। আগস্ট ২০২৫-এ পটপরিবর্তনের পর আইনি প্রক্রিয়ায় সব মামলা থেকে খালাস পান বাবর এবং ১৬ জানুয়ারি ২০২৫ কারাগার থেকে মুক্ত হন। তিনি ফিরে যান নিজের নির্বাচনী এলাকা নেত্রকোনা-৪ (মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুরি) এবং ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নিয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এক লাখ ২০ হাজার ৯৬১ ভোটে বিজয়ী হন। তিনি মোট ১ লাখ ৬০ হাজার ৮০১ ভোট পান, আর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. আল হেলাল দাঁড়িপাল্লা প্রার্থী পেয়েছেন ৩৯ হাজার ৮৪০ ভোট।
আবদুস সালাম পিন্টুও বাবরের মতো দীর্ঘ কারাজীবন কাটান। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তাকে। ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান এবং জন্মস্থান টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচনে তিনি প্রায় ১ লাখ ৯৮ হাজার ভোট পান, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের হুমায়ুন কবির পেয়েছেন ৬০ হাজার ৮৭১ ভোট।
রংপুর-২ (তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ) আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম। ২০১২ সালের ২২ আগস্ট মগবাজারের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে। ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আপিলের শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ৩০ অক্টোবর আপিল বিভাগ রায় দেন। ২০২০ সালের ১৫ মার্চ আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পর তার আপিলের নতুন করে শুনানি হয় এবং ২০২৫ সালের ২৮ মে তাকে খালাস দেওয়া হয়। নির্বাচনে আজহারুল ইসলাম নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকারকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করে এক লাখ ৩৯ হাজার ৬৮০ ভোটে বিজয়ী হন, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৯১০ ভোট।
গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক মানচিত্রে এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন। স্বৈরাচারের যুগ শেষ, কারাগারের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আজ তিন নেতার বিজয় তাদের নির্বাচনী এলাকা ও সমগ্র দেশে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা ঘটিয়েছে। তাদের নির্বাচনী জয় শুধু ব্যক্তিগত মুক্তি নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজির স্থাপন করেছে, যা জনসাধারণের রাজনৈতিক সচেতনতা ও ভোটের শক্তিকে সামনে নিয়ে এসেছে।