
২০২৪ এর জুলাইয়ে বাংলাদেশে ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সময়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও দমন-পীড়নের ঘটনায় দায়িত্বর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে, কারণ বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলার রায় ঘোষণা হওয়ার কয়েকদিন আগে তিনি প্রথমবার ই-মেইলের মাধ্যমে বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এই সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে চলমান বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি একটি “ক্যাঙ্গারু কোর্টের প্রহসন।”
হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ চলাকালীন সময়ে শতাধিক হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় তিনি মূল ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে তিনি এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর এটি তার প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্য। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার অনুপস্থিতিতে যে বিচার চলছে, তা শুরু থেকেই “পূর্বনির্ধারিত দোষী সাব্যস্ত রায়ের” দিকে এগোচ্ছিল।
রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত হলে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। আদালতের ঘোষণার অপেক্ষায় রাজধানী ঢাকার ট্রাইব্যুনাল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রায়ের দিনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কড়া করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়ানো যায়।
এই মামলার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ অনুসারে, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রিত ইউনিটের মাধ্যমে ৪১টি জেলার ৪৩৮টি স্থানে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এবং ৫০টিরও বেশি জেলায় মারাত্মক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত হয়েছে লিক করা অডিও রেকর্ডিং এবং অন্যান্য প্রমাণাদি, যা রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগকে সমর্থন করে। তবে হাসিনা এবং তার আইনজীবীরা দাবি করছেন, অনেক প্রমাণ প্রাসঙ্গিক নয় এবং মামলা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
হাসিনার বক্তব্যে স্পষ্ট, তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এই মামলা ব্যবহার করছে তাকে দায়ী সাব্যস্ত করার জন্য। তিনি আরও বলেন, তার আইনজীবী নিয়োগ বা যথাযথ প্রতিরক্ষা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এই বিষয়গুলো দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। রায়ের দিন রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থিতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, এবং জনসমর্থন—সব মিলিয়ে এটি একটি সংবেদনশীল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
বিশেষ ট্রাইব্যুনালের রায় বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একদিকে এটি দেশের বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং গণতান্ত্রিক স্বীকৃতির পরীক্ষার মতো, অন্যদিকে সেই ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনে নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের জন্যও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। এই রায় দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, যা দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত ও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। অপরদিকে মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কারণ হত্যাকাণ্ড এবং গুলির নির্দেশ দেওয়ার প্রমাণ এবং অন্যান্য প্রমাণের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই রায়ের ফলাফল কেবল আইনগত বিচার নির্ধারণ করবে না, বরং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জনগণের বিশ্বাসের ওপরও প্রভাব ফেলবে।
রায়ের আগে ঢাকার ট্রাইব্যুনাল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে থাকবে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ট্রাইব্যুনাল এলাকায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এই রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জনগণের মাঝে বিশ্বাসের পরীক্ষা হবে। বিশেষত, আন্দোলনের সময় নিহত ছাত্রনেতা ও সাধারণ নাগরিকদের পরিবার এই রায়কে ঘিরে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং প্রতীক্ষার মধ্যে আছে। সাধারণ জনগণের নজরও রায়ের দিকে সরব। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে মনে করা হচ্ছে।