সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তাজউদ্দীন আহমদের পুত্র তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ ইউটিউবে প্রচারিত সম্প্রতি এক গণমাধ্যমে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের বর্তমান রূপ, দলের অভ্যন্তরীণ অবক্ষয় এবং শেখ হাসিনার শাসনামলে তাঁর পরিবার যে ধরণের নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ এখন হয়ে গেছে জম্বি লীগ।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, দলের ভেতর কোনও আত্মসমালোচনা, অনুতাপ কিংবা জনদুর্ভোগের প্রতি দায়বোধ নেই।
সোহেল তাজের ভাষায়, আওয়ামী লীগ এখন ‘এক চেম্বার পার্টি’। দলের ভেতরকার নেতাকর্মীরা নিজেরাই নিজেদের কথা শোনে, নিজেরাই নিজেদের প্রশংসা করে এবং বাস্তবতা বিবর্জিত প্রপাগান্ডার মধ্যে বাস করে। তিনি বলেন, “আপনি খেয়াল করবেন আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় থাকে, চারিদিকে তাদের মাইক্রোফোন আর লাউডস্পিকার—তাদের কথাই তারা শুনছে।” এই আত্মঘূর্ণির রাজনীতিতে তিনি আর থাকতে চান না।
তিনি আরও বলেন, “উনি (শেখ হাসিনা) আবার ভাবছেন আসলেই উনার জন্য সবাই পাগল হয়ে গেছে। হরতাল, সমাবেশে নিরীহ মানুষগুলোকে ঠেলে দিচ্ছে নির্যাতনের দিকে।” এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন রাজনীতির ধারা মানবিকতা ও নৈতিকতার স্তম্ভ থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
সোহেল তাজ অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা জাতীয় চার নেতাকে তাঁর রাজনৈতিক চর্চায় সম্মান দেখান না। “উনি আমার আব্বুকে (তাজউদ্দীন আহমদকে) চায় না, আমার ফুফাকে (এএমএ মুহিতকে) চায় না, আমাদের পরিবারের কাউকেই চায় না,”—এই বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক এবং পারিবারিক ক্ষোভ স্পষ্ট করে।
তিনি নিজের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “আপনার বাবা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, আপনি দলের জন্য কাজ করেছেন, অথচ সে পরিবারের কাউকে শেখ হাসিনা তার পাশে চায় না।” এতে বোঝা যায়, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা স্তম্ভগুলো থেকে বর্তমান নেতৃত্ব কীভাবে নিজেকে আলাদা করে তুলেছে।
সোহেল তাজ তাঁর বক্তব্যে বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে তাঁদের পরিবারের প্রতি বারবার অবিচার করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমাদের পরিবারের ওপর অবিচার হয়েছে, অবহেলা হয়েছে।” এমনকি ২০০৯ সালে মন্ত্রীত্ব থেকে পদত্যাগ করার পর তাঁর সঙ্গে তেমন যোগাযোগও রাখেননি আওয়ামী লীগ নেতারা।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিকটি হলো, সোহেল তাজের ভাগ্নে ইফতেখার তাজ গুম হন। তাঁর দাবি, সরকারের ‘গভীর প্রভাবশালী মহল’ এই গুমে জড়িত। তিনি বলেন, “আমার ভাগ্নেকে তুলে নেওয়া হয়, আমি নিজে খুঁজে বের করি কোথায় আছে, রাষ্ট্র কিছু করেনি।” ভাগ্নের কাছে বলা হয়,”তোমার মামা আমাদের নেক্সট টার্গেট।” এই বক্তব্য রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনা ও গুম সংস্কৃতির প্রতি একটি জোরালো নিন্দা।
সোহেল তাজের মন্তব্যে বারবার উঠে এসেছে, শেখ হাসিনা নিজে দল ও রাষ্ট্রের কল্যাণে নন। তিনি বলেন, “উনি কাউকে গুরুত্ব দেন না, একজন স্বৈরাচারীর মত চালাচ্ছেন দলটাকে।” তাঁর মতে, শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনও গণতান্ত্রিক ধারা রাখতে চান না, বরং নিজের মতেই দল পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, “এই দলটাকে উনি নিজের মত বানিয়ে ফেলেছেন। এটা আর আওয়ামী লীগ না, এটা হাসিনা লীগ।”
তাঁর মতে, এই একক আধিপত্যই আওয়ামী লীগকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক অভিশাপ হয়ে উঠছে। আওয়ামী লীগে ফিরতে চান কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে বিরক্তি প্রকাশ করে জানান তিনি রাজনীতি নিয়ে এখন মোটেই আগ্রহী নন।
সোহেল তাজের এই সাহসী বক্তব্য বর্তমান রাজনীতির একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ তুলে ধরে। একজন প্রাক্তন মন্ত্রী, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং দলীয় কর্মী হিসেবে তাঁর এই বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়—এটি আওয়ামী লীগের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ ও অপসাংস্কৃতিক রাজনীতির প্রতিফলন। তাঁর এই বক্তব্য নতুন আলোচনার সূত্রপাত করতে পারে, যদি তা জনসাধারণ ও দলীয় মহলে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়।