
ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই প্রকৃতি যেন নিজের রঙের পসরা সাজায়। শিশিরভেজা পাতার ফাঁক গলে ফুটে ওঠা ফুলগুলো কখনো লাজুক, কখনো উজ্জ্বল, আবার কখনো নীরবে কোনো গল্প বলে যায়। ফুল এখানে শুধু সৌন্দর্য নয়, এটি প্রকৃতির সংবেদনশীল ভাষা।
ঠিক এমন এক অনুভূতি জাগে কুমিল্লার বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্টে (বার্ড) প্রবেশ করলেই। ইট–কংক্রিটের শহুরে কোলাহলের বাইরে, এই প্রতিষ্ঠান যেন একটি বিস্তৃত ফুলের বাগান। বছরের এই সময়ে বার্ড ক্যাম্পাস রঙিন ফুলের চাদরে ঢেকে যায়। লাল, হলুদ, সাদা, বেগুনি নানা রঙের ফুল চোখে আনে প্রশান্তি, মনে জাগায় সৃজনশীলতার নরম আবেশ।
ভোরের কোমল রোদে শিশিরভেজা পাপড়িতে আলো ঝিলমিল করে ওঠে। সেই আলোয় বার্ডের পথঘাট হয়ে ওঠে আরও জীবন্ত। কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন আর সামাজিক গবেষণার গুরুগম্ভীর পরিবেশের সঙ্গে এই ফুলের সমাহার বার্ডকে দিয়েছে ভিন্ন এক পরিচয়। এখানে জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি নান্দনিক সৌন্দর্যও সমান গুরুত্ব পায়।
বার্ডে হাঁটলে চোখে পড়ে পরিকল্পিত বাগান, ছায়াঘেরা পথ আর ফুলে সাজানো প্রাঙ্গণ। গবেষক, প্রশিক্ষণার্থী কিংবা দর্শনার্থীরা এখানে এসে শুধু কাজের চাপ থেকে মুক্ত হন না, প্রকৃতির সান্নিধ্যে মানসিক প্রশান্তিও খুঁজে পান।
১৯৫৯ সালের ২৭ মে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি কুমিল্লা নগর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে কোটবাড়ি এলাকায় লালমাই–ময়নামতি পাহাড়ের পাদদেশে ১৫৬ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন এই স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রায়োগিক গবেষণার মাধ্যমে পল্লী মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছে। সেই দায়িত্বের পাশাপাশি বার্ড তার প্রাঙ্গণের সৌন্দর্য রক্ষাতেও সমান যত্নবান।
এই সৌন্দর্যের পেছনে আছে নীরব শ্রম। মালি মো. ফুরকান জানান, ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি বার্ডের বাগানে কাজ করছেন। মৌসুমি ফুলের চারা রোপণ থেকে শুরু করে ফুল ফোটানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে গাছের যত্ন নেওয়াই তার কাজ। “গাছগুলোতে যখন নানান রঙের ফুল ফুটে, তখন মনে হয় আমার পরিশ্রম সার্থক,” বলেন তিনি।
আরেক মালি আবুল হাসেম মিয়া বলেন, বাইরে থেকে মানুষ এসে ফুল দেখে, ছবি তোলে। এই দৃশ্য তাকে আনন্দ দেয়। “এই গাছগুলো আমি নিজে হাতে বড় করেছি। প্রতিদিন পরিষ্কার করি, পানি দিই। বার্ডের সৌন্দর্য গড়ে তুলতে পেরে ভালো লাগে,” যোগ করেন তিনি।
দর্শনার্থীদের অনুভূতিও আলাদা। স্কুল শিক্ষার্থী আরহাম বলে, “এখানে এসে সত্যিই ভালো লাগছে। ফুলগুলো এত সুন্দরভাবে সাজানো যে চোখ জুড়িয়ে যায়। দৈনন্দিন কোলাহল ভুলে মনটা শান্ত হয়ে যায়। জায়গাটার সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে যারা এটা গড়ে তুলেছেন, তাদের যত্নও স্পষ্ট বোঝা যায়।”
বার্ডের বাগান শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক (কৃষি ও পরিবেশ) মো. সালেহ আহমেদ জানান, প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পরিকল্পিতভাবে ফুল চাষ করা হচ্ছে। এ বছর সেই উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে নেওয়া হয়েছে। গত বছরের তুলনায় তিনটি নতুন বাগান যুক্ত হওয়ায় ফুলের পরিসরও বেড়েছে। সব মিলিয়ে এবার ১৫ হাজারের বেশি ফুলের চারা রোপণ করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, অক্টোবরের শেষ দিকে বাগান প্রস্তুতের কাজ শুরু হয় এবং নভেম্বরের শুরুতেই ফুলগাছ লাগানো হয়। এর ফলেই ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে পুরো ক্যাম্পাস রঙে ভরে ওঠে। ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত এই সৌন্দর্য থাকবে।
বার্ডের ফুলবাগান তাই শুধু চোখের আরাম নয়। এটি কাজের ফাঁকে একটুখানি থামার জায়গা, যেখানে প্রকৃতি নীরবে হাসে আর মানুষ সেই হাসিতে সামান্য শান্তি খুঁজে পায়।
আনজান তুষার,
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়