গণ-অভ্যুত্থানে বানিয়াচংয়ে পুলিশের গুলিতে আটজন নিহত, জনতার প্রতিশোধে এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে পিটিয়ে হত্যা - দৈনিক সাবাস বাংলাদেশ
নোটিশ:
শিরোনামঃ
গ্লোবাল সামুদ ফ্লোটিলা গাজায় রওনা, ৫০টির বেশি জাহাজে মানবিক সহায়তা জাপানের শিনকোইয়া মসজিদে প্রতি রবিবার এশার পর সাপ্তাহিক ইসলামিক আলোচনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষ, ১৪৪ ধারা জারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতা, ৫০ শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি মনোনয়ন বিতরণের শেষদিনে রাকসু কার্যালয়ে ভাঙচুর করল রাবি ছাত্রদল পাগলা মসজিদের দানবাক্সে রেকর্ড ১২ কোটি ৯ লাখ টাকা তাসকিন–লিটনের ঝড়ে ডাচদের সহজে হারাল বাংলাদেশ, সিরিজে ১–০ নেতৃত্ব সাবেক ভিপি নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে কুড়িগ্রামে বিক্ষোভ কেরালায় ক্যানারা ব্যাংকে গরুর মাংস নিষিদ্ধ, কর্মীদের ‘বিফ-ফেস্ট’ প্রতিবাদ ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম: জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধসহ তিন দফা দাবিতে গণঅধিকার পরিষদের হুঁশিয়ারি

গণ-অভ্যুত্থানে বানিয়াচংয়ে পুলিশের গুলিতে আটজন নিহত, জনতার প্রতিশোধে এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে পিটিয়ে হত্যা

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় শনিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৫
  • ৫৩ বার দেখা হয়েছে

পাঁচই অগাস্ট ২০২৪, দেশজুড়ে উত্তাল গণ-অভ্যুত্থানের দিন হঠাৎ করেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে বানিয়াচং থানার জনপদ। বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, এরপর পুলিশের গুলিতে কমপক্ষে আটজন গ্রামবাসীর মৃত্যু। এই রক্তপাতই উসকে দেয় গণআক্রোশ। শত শত গ্রামবাসী বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং বানিয়াচং থানাকে ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে তারা হামলা চালায় থানায়, আগুন দেয় ভবনে, অস্ত্র লুট করে এবং থানার ভেতরে থাকা ৫০ জনের বেশি পুলিশ সদস্যকে অবরুদ্ধ করে রাখে। বিবিসি বাংলার বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে সেদিনের ঘটনা উঠে এসেছে।

বিক্ষুব্ধ জনতার দাবি ছিল স্পষ্ট—পুলিশ হত্যার প্রতিশোধ। বিক্ষোভকারীরা সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দরকষাকষিতে লিপ্ত হয়। রাতভর আলোচনা চললেও উত্তেজনা কমে না। এক পর্যায়ে তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—যদি এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে তাদের হাতে না তুলে দেওয়া হয়, তবে তারা কাউকে থানার বাইরে যেতে দেবে না। সেনাবাহিনী চেষ্টার পরও সন্তোষ চৌধুরীকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। গভীর রাতে তাকে থানার ভেতর থেকে বের করা মাত্রই বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে পিটিয়ে হত্যা করে। পরদিন তার মৃতদেহ থানার সামনে একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে জনতা সব পুলিশকে হত্যা করার দাবি তোলে। কিন্তু সেনাবাহিনী আপত্তি জানালে তারা সন্তোষ চৌধুরীকে বেছে নেয়। জানা যায়, থানায় অবরুদ্ধ পুলিশের মধ্যে থাকা কর্মকর্তারা আশায় ছিলেন সেনাবাহিনী অন্তত তাদের সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু তারা হতবাক হয়ে যান, যখন সেনা উপস্থিতিতেই সন্তোষকে জনতার হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

সন্তোষ চৌধুরীকে কেন টার্গেট করা হয়েছিল, তা নিয়েও রয়েছে নানা মত। কেউ বলছেন, পাঁচই অগাস্ট গুলি চালানোর দায়ে এবং অতীতে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে তার বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি হয়। আবার কেউ বলছেন, তিনি ছিলেন মাদকের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে থাকা একজন সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা। স্থানীয় একজন জানান, “মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে তিনি অনেককে গ্রেপ্তার করেছিলেন। যারা মাদকের ব্যবসা করত, তারাই এই আন্দোলনে তাকে টার্গেট করে।”

অন্যদিকে তদন্ত কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, এদিন হাজার হাজার মানুষ থানায় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে, পুরো ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওপরতলায় একটি ঘরে অবরুদ্ধ ছিলেন প্রায় ৬৫ জন পুলিশ সদস্য। নিচের অস্ত্রাগারে আগুন লাগায় ধোঁয়ায় তারা প্রায় দমবন্ধ অবস্থায় ছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তা আবু হানিফ বলেন, “আর ১০-১৫ মিনিট থাকলে আমরা বেঁচে থাকতে পারতাম না। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরের মতো পরিস্থিতি হতে পারত।”

তবে প্রশ্ন উঠেছে—সেনাবাহিনী ও প্রশাসন উপস্থিত থাকার পরও কেন সন্তোষ চৌধুরীকে বাঁচানো গেল না? তার বাবা কষ্টভরা কণ্ঠে বলেন, “সবাই বাঁচলো, আমার ছেলে কেন বাঁচলো না?” সন্তোষ ছিলেন পরিবারের একমাত্র ছেলে, দশ মাস আগে বিয়ে হয়েছিল, সন্তান জন্মেছে তার মৃত্যুর তিন মাস পর।

ঘটনার পরে গত বছর ২২ আগস্ট একটি হত্যা মামলা দায়ের করে পুলিশ। কিন্তু তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই, এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, “বিচার করে শাস্তি দেন, জেলে রাখেন। কিন্তু মারলে তো আপনি একটি নৈরাজ্যকে উৎসাহিত করলেন।”

চব্বিশের অভ্যুত্থানে এমন ঘটনা শুধু বানিয়াচংয়েই নয়। সারা দেশে জুলাই-অগাস্ট মাসে একাধিক থানা আক্রান্ত হয়, পুলিশের ওপর গণআক্রোশ দেখা দেয়। কোথাও কোথাও থানার ভেতরেই হত্যা করা হয় পুলিশ সদস্যদের। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৫ জন পুলিশকে হত্যার বিভৎস ঘটনার বর্ণনায় স্তব্ধ হয়ে যান অনেকে। একজন নিহত পুলিশ সদস্যের মেয়ে বলেন, “মুখ চেনা যাচ্ছিল না, মাথা ফেটে ঘিলু বের হয়ে গিয়েছিল।”

মানবাধিকার আইনজীবী এলিনা খান বলেন, “যা-ই ঘটুক, প্রত্যেক হত্যার একটা তদন্ত হওয়া উচিত। ইতিহাসে যেন কিছুই বাদ না পড়ে। দায়মুক্তির জায়গা যেন না থাকে।”

কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, এমনকি তদন্ত পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়। এই নির্দেশনাকে অনেকেই “দায়মুক্তি” বলেই দেখছেন।

শেয়ার করুন

Comments are closed.

এই ধরনের আরও নিউজ

© কপিরাইট ২০২৪-২০২৫ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: NagorikIT