হামাসের সামরিক শাখা কাসাম ব্রিগেডের মুখপাত্র আবু ওবায়দা এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, গাজায় আটক সব বন্দিকে মুক্ত করার একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির প্রস্তাব তারা দিয়েছিল, কিন্তু তা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তার কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রায় ২০ মিনিটের প্রাক-রেকর্ড করা এ বক্তব্য শুক্রবার প্রকাশ করা হয়। সেখানে তিনি বলেন, এই প্রস্তাবে সব বন্দিকে একসাথে মুক্ত করার কথা থাকলেও ইসরায়েল এতে সম্মত হয়নি।
তিনি বলেন, “আমাদের কাছে এটা স্পষ্ট যে নেতানিয়াহুর অপরাধী সরকার আসলে বন্দিদের কোনো মূল্যই দেয় না, কারণ তারা সবাই ইসরায়েলি সেনা।” তিনি আরও জানান, হামাস এমন একটি সমঝোতা চায় যা যুদ্ধের অবসান ঘটাবে, ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার নিশ্চিত করবে এবং অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তা প্রবেশের পথ খুলে দেবে।
বর্তমানে কাতারে যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে, যদি সেখান থেকে ইসরায়েল সরে আসে, তবে হামাস কোনো আংশিক চুক্তিতে ফিরবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন আবু ওবায়দা। এই আলোচনায় বর্তমানে ৬০ দিনের একটি আংশিক চুক্তির প্রস্তাব রয়েছে, যাতে ১০ জন বন্দি মুক্তির কথা রয়েছে। তবে হামাস এখনো প্রায় ৫০ জনকে আটকে রেখেছে, যাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন জীবিত বলে ধারণা করা হয়।
এদিকে হোয়াইট হাউসে আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে এক নৈশভোজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, “আমরা অধিকাংশ বন্দিকে ফিরিয়ে এনেছি। খুব শিগগিরই আরও ১০ জন মুক্তি পাবে বলে আশা করছি।” যদিও তিনি কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি, এবং তাঁর বহুদিনের দাবি—যে চুক্তি আসন্ন—তা এখনো বাস্তব হয়নি।
আবু ওবায়দা মার্চের পর এই প্রথম ভিডিও বার্তা প্রকাশ করলেন। সেখানে তিনি বলেন, হামাসের যোদ্ধারা দীর্ঘস্থায়ী এক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং গাজা জুড়ে বিভিন্ন স্থানে তারা হামলা চালিয়ে ইসরায়েলি সেনাদের হত্যা বা আটক করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
তিনি আরব ও মুসলিম দেশের নেতাদেরও কঠোর ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, “ইসরায়েলের গণহত্যার সামনে আপনারা চুপ থেকে লাখ লাখ নিরীহ মানুষের রক্তের দায় কাঁধে নিচ্ছেন।”
দোহায় চলমান আলোচনা এখনো কোনো অগ্রগতি আনেনি। কারণ ইসরায়েল গাজার উপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পাশাপাশি সম্প্রসারণেরও চেষ্টা চালাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মোরাগ করিডোর ও মাগেন ওজ করিডোর, যা গাজার দক্ষিণের রাফাহ ও খান ইউনুসকে বাকি অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।
ইসরায়েলি সেনারা এখনো মানবিক সহায়তা আটকিয়ে রাখছে এবং বিতর্কিত GHF পরিচালিত সহায়তা কেন্দ্রে অনাহারে কাতর ফিলিস্তিনিদের গুলি করে হত্যা করছে। এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক সমালোচনার তোয়াক্কা না করে রাফাহ ধ্বংসস্তুপের ওপর একটি নতুন বন্দি শিবির নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে ইসরায়েল।
শুক্রবারই ইসরায়েলি হামলায় কমপক্ষে ৪১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে আল জাজিরাকে নিশ্চিত করেছে গাজার চিকিৎসা সূত্র।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৫৮,৬৬৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১,৩৯,৯৭৪ জন। মার্চে শেষ যুদ্ধবিরতি ভাঙার পর থেকে অন্তত ৭,৮৪৩ জন নিহত ও ২৭,৯৯৩ জন আহত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত শিশু-বৃদ্ধসহ নানা বয়সী মানুষ এখন চরম ক্লান্তি ও অবসন্নতা নিয়ে গাজার অল্প কয়েকটি অর্ধ-বিধ্বস্ত হাসপাতালে জরুরি সেবার জন্য ছুটে আসছেন। এমন ভীষণ দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি গাজায় ‘অভূতপূর্ব’ বলে আখ্যায়িত করেছে তারা।