বোরো মৌসুমে ধান কাটার পর সরবরাহ বাড়ার কথা থাকলেও চালের বাজারে দেখা দিয়েছে বিপরীত চিত্র। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চালের কেজি প্রতি দাম হঠাৎ ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ভোক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে সরকারও।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দর কম থাকলেও বাজারে সিন্ডিকেটের কারণে দাম বাড়ছে। খুচরা বাজারে মিনিকেট, ব্রি-২৮, ব্রি-২৯, স্বর্ণাসহ প্রায় সব ধরনের চালেই গত কয়েক সপ্তাহে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা এসএম আকাশ জানান, ঈদের আগে মোজাম্মেল কোম্পানির ৫০ কেজির মিনিকেট চালের বস্তা ৪ হাজার টাকার কমে কিনলেও ঈদের পরপরই সেটি বেড়ে ৪৫০০ টাকায় পৌঁছায়। তার অভিযোগ—”দেশটা যেন মগের মুল্লুক হয়ে গেছে। সিন্ডিকেট ছাড়া ভরা মৌসুমে এমন দাম বৃদ্ধির কোনো ব্যাখ্যা নেই।”
চাল বিক্রেতাদের দাবি, মিল মালিকরা ধানের দাম বাড়ার কথা বলে চালের দাম বাড়িয়েছেন। তবে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক, পরিবহন ব্যয় বা শ্রমিক মজুরিও বাড়েনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। চলতি বছর রেকর্ড ২ কোটি ১৪ লাখ টন বোরো চাল উৎপাদনের খবর থাকলেও তাতে বাজার স্থিতিশীল হয়নি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যে দেখা যায়, জুনে বিশ্ববাজারে চালের দাম ০.৮ শতাংশ কমেছে।
রাজধানীর বাবুবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানায়, ঈদের পর হঠাৎ করেই মিনিকেট চালের দাম বস্তাপ্রতি ৩০০–৪০০ টাকা বেড়েছে। তারসঙ্গে যোগ হয়েছে বাড়তি পরিবহন ভাড়া, যা খুচরা বাজারে প্রভাব ফেলেছে।
নয়াবাজারে এখন তীর ডায়মন্ড, সাগর, রশিদ প্রভৃতি ব্র্যান্ডের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৮০–৮২ টাকায়। মোজাম্মেল ব্র্যান্ডের চালের দাম ৮৬–৯০ টাকা। ঈদের আগে এসব চালের দাম ছিল ৭৫–৮০ টাকার মধ্যে। মোটা চালের দামও বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা বেড়েছে।
ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, জুন মাসে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৭–৮ টাকা। মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৮২–৮৫ টাকায় এবং মোটা চাল ৫৬–৬০ টাকায়।
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী বাচ্চু মিয়া বলেন, “সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ চালের দাম বাড়ার কোনো যুক্তি নেই। বড় কোম্পানিগুলো সিন্ডিকেট করে বাজারকে অস্থির করেছে।”
অন্য একজন ব্যবসায়ী আতিকুর রহমান জানান, করপোরেট ব্যবসায়ীরা বোরো মৌসুমের শুরুতেই অধিকাংশ ধান কিনে মজুত করে রেখেছেন। এতে সাধারণ মোকাম ও ছোট মিলাররা ধান পায়নি, যার ফলে ধানের দাম বাড়তি ও চালের দাম অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
বাবুবাজারের আড়ৎদার আমজাদ হোসেন বলেন, “ধান-চালের বাজার এখন অটো রাইস মিল ও বড় করপোরেট হাউসের নিয়ন্ত্রণে। তারাই সিন্ডিকেট করে ধান কিনে বাজার চড়া করে তুলছে।”
ভোক্তাসাধারণ বলছে, সরকারের নজরদারির অভাব এবং তদারকির দুর্বলতার কারণেই মিলাররা দাম বাড়িয়ে চলেছে। একাধিক খুচরা বিক্রেতা জানান, আমদানি ও উৎপাদন স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও সরকারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতার কারণেই বাজারে এই অস্থিরতা।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলীম আখতার খান জানান, “আমরা নিয়মিত বাজার মনিটর করছি। অযৌক্তিকভাবে মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনও আইন অনুযায়ী অভিযান চালাতে পারে।”
কনসিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “বাজার সিন্ডিকেট এখনো আগের মতোই সক্রিয়। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বাজারকে জিম্মি করে রেখেছে। রাজনীতিকদের এই বিষয়ে নীরবতা রহস্যজনক।”
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. সামিউল ইসলাম মনে করেন, “অসাধু মিল মালিক ও করপোরেট ব্যবসায়ীদের কারণে চালের বাজার অস্থির। সরকার যদি নজরদারি বাড়ায় এবং অবৈধ মজুতকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বাজার স্বাভাবিক হতে পারে।”
এদিকে, কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “এবার বোরো উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ১৫ লাখ টন বেশি হয়েছে। তারপরও চালের দাম বাড়তি। সরকার নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। গণমাধ্যমের সহযোগিতা প্রয়োজন।