যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ব্যস্ততম এলাকা মিডটাউনে একটি বহুতল অফিস ভবনে ভয়াবহ বন্দুক হামলায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক পুলিশ কর্মকর্তাসহ চারজন নিহত হয়েছেন। হামলার পর পুরো এলাকা আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। নিহত পুলিশ সদস্য ছিলেন নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ বিভাগের (NYPD) অফিসার দিদারুল ইসলাম। তিনি ডিউটিতে না থাকলেও দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ৩৪ মিনিটে, নিউইয়র্কের ৩৪৫ পার্ক অ্যাভিনিউতে অবস্থিত একটি অফিস ভবনে। এই ভবনেই এনএফএল, কেপিএমজি এবং ব্ল্যাকস্টোনের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ২৭ বছর বয়সী শেন ডেভন তামুরা নামের এক বন্দুকধারী ভবনে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করেন। তিনি একটি আধুনিক এম-ফোর রাইফেল এবং একাধিক ম্যাগাজিন নিয়ে ভবনে প্রবেশ করেন। তাঁর গাড়ি থেকে পরবর্তীতে আরও একটি রিভলবার, ব্যাকপ্যাক, গুলিভর্তি ম্যাগাজিন এবং ওষুধ উদ্ধার করা হয়। তাঁর কাছে নেভাদা রাজ্যের ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া গেছে।
সন্দেহভাজন হামকারিকে বন্দুক হাতে নজরদারি ক্যামেরায় দেখা যায়
প্রথমেই হামলাকারী ভবনের লবিতে থাকা পুলিশ অফিসার দিদারুল ইসলামকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি। এরপর তিনি ভবনের ভেতরে ঢুকে আরও তিনজনকে গুলি করেন—তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন নারী কর্মচারী, একজন নিরাপত্তাকর্মী এবং একজন অফিস স্টাফ। পরে হামলাকারী ভবনের ৩৩ তলায় উঠে গিয়ে নিজের গলায় গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন। তবে নিউইয়র্ক পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি সে কীভাবে মারা গেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানায়, হামলাকারী নিজেই আত্মঘাতী গুলিতে মারা যান।
বন্দুকধারীর হামলার পর ঘটনাস্থলে নিউইয়র্ক পুলিশের তৎপরতা
এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন বিবিসি নিউজের নিউইয়র্ক প্রতিনিধি ইন্দ্রানী বসু। তিনি জানান, “আমি সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটের দিকে পার্ক অ্যাভিনিউ ও ৫১ স্ট্রিটের কোণায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন দেখি নিউইয়র্ক পুলিশের তিনটি গাড়ি আর দুটি ফায়ার সার্ভিসের ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। এক লোককে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তার বুকে ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল। আরেক পথচারী জানালেন, তিনি অন্তত ছয়টি গুলির শব্দ শুনেছেন।”
নিহত দিদারুল ইসলাম ছিলেন নিউইয়র্কের ব্রঙ্কস এলাকার বাসিন্দা। তাঁর স্ত্রী বর্তমানে সন্তানসম্ভবা এবং এই দম্পতির আরও দুটি ছোট সন্তান রয়েছে। তিনি ৩ বছর ধরে এনওয়াইপিডি-তে কাজ করছিলেন এবং তাঁর সহকর্মীরা বলছেন, তিনি ছিলেন দায়িত্ববান, নীতিবান ও সহানুভূতিশীল মানুষ। ঘটনার সময় তিনি ডিউটিতে ছিলেন না, কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন জনগণের, ঠিক একজন পুলিশ সদস্য যেভাবে থাকেন।
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র এরিক অ্যাডামস এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, “অফিসার দিদারুল ইসলাম ছিলেন একজন সত্যিকারের বীর। তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যদের রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। নিউইয়র্ক সিটি তাঁর আত্মত্যাগ চিরকাল স্মরণে রাখবে।”
NYPD কমিশনার জেসিকা টিশ বলেন, “দিদারুল ইসলাম আমাদের সেই পুলিশ সদস্যদের একজন, যাঁরা মানুষের নিরাপত্তার জন্য নিজের জীবন বাজি রাখেন। তিনি শান্তভাবে কর্তব্য করে গেছেন এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সাহসিকতা দেখিয়েছেন। আমরা তাঁর আত্মত্যাগে গভীরভাবে শোকাহত।” তিনি আরও জানান, হামলাকারীর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আগে থেকেই তথ্য ছিল এবং তিনি একাই কাজ করেছেন, তার সঙ্গে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর যোগসূত্র এখনও পাওয়া যায়নি। তদন্ত চলছে এবং কেন তিনি এই নির্দিষ্ট ভবনকে টার্গেট করলেন, সেটি বোঝার চেষ্টা করছে পুলিশ।
এই ঘটনায় পুরো নিউইয়র্ক শহরজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। প্রবাসী বাংলাদেশিরা দিদারুল ইসলামের মৃত্যুতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই সাহসী পুলিশ কর্মকর্তার আত্মত্যাগ নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে।
একদিকে এই ঘটনা যেমন নিউইয়র্ক সিটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, তেমনি বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য গর্ব ও শোক—দুই অনুভূতিরই উৎস হয়ে উঠেছে পুলিশ কর্মকর্তা দিদারুল ইসলামের জীবন আর মৃত্যু।