
মধ্যযুগীয় বর্বরতা শব্দের বিপরীতে আমি অধুনাকালিক বর্বরতা শব্দ প্রবর্তন করলাম।
অধুনা অর্থ আধুনিক যুগ। আমার কাছে মনে হয় বর্তমান সময়ে যে বর্বরতা হয় মধ্যযুগ তার কাছে নস্যি। যুদ্ধের কথাই ধরুন না। মধ্যযুগে যখন রাজায় রাজায় যুদ্ধ হত, তা হত বিশাল একটি ময়দানে, যাকে যুদ্ধক্ষেত্র বলা হত। এই ময়দানে দুই পক্ষ দুই দিক থেকে হা রে রে করে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে ছুটে আসত। একে অপরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত নির্মম আক্রোশে। মারত-মরত, পায়ের নিচে ধুলা উড়ত। পতাকা হাতে একজন থাকত, যাকে বলা পতাকাবাহী বা নিশান বরদার, তার চারদিক থাকত চৌকস সেনাবেষ্টিত। কারণ কোনোরকম তাকে হত্যা করে তার হাতের পতাকা ভূলুন্ঠিত করতে পারলেই যুদ্ধ শেষ। যে পক্ষ এটা করতে পারত, তারা নিজেকে জয়ী ঘোষণা করত আর অপরপক্ষও বিনাবাক্যব্যয়ে এই দাবি মেনে নিত।
দিনভর যুদ্ধ চললেও সন্ধ্যা হলে যখন সূর্য নামত পাটে, তখন ভেরি বাজিয়ে উভয় পক্ষকে সতর্ক করত ভেরিবাদক, সাথে সাথে খাপে ঢুকে যেত তরবারি। আর কোনো আঘাত নয়। নিজ নিজ তাঁবুতে ফিরে যেত সৈন্যরা, মশাল জ্বালিয়ে আড্ডা দিত, খাওয়া-দাওয়া করত, কবিতা পাঠ করত, গান গাইত, আহতের শরীরে ব্যান্ডেজ করা হত, নিহতদের সৎকার করা হত, স্ত্রীদের সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হত সৈন্যরা, এরপর ঘুমিয়ে পড়ত। পরদিন নির্দিষ্ট সময়ে আবারও রনভেরি বাজলে নাঙা তলোয়ার হাতে হা রে রে করে ছুটে যেত। এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস যুদ্ধ চলত পতাকা ফেলে দেওয়া পর্যন্ত, অথবা কোনো একটা পক্ষ পরাজয় স্বীকার করা পর্যন্ত। রাতের বেলা যখন সব সৈন্য ঘুমিয়ে পড়ত, তখন সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য বের হত গুপ্তচর। কিছু সৈন্য তাই পালা করে তাদের তাঁবুগুলোতে পাহারা দিত, গুপ্তচর দেখলেই খতম করে দিত।
এক পক্ষ চেষ্টা করত অপরপক্ষের রসদ যোগানের ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করতে, যেন বেশিদিন যুদ্ধের ময়দানে তিষ্ঠাতে না পারে প্রতিপক্ষ, পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়। হঠাৎ যদি দেখা যেত দূর দিগন্ত থেকে সাদা পতাকা উড়িয়ে কেউ আসছে, তাহলে সৈন্যশিবিরে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যেত। যে আসছে ঘোড়ার কেশরে ঢেউ তুলে, ধুলো ছুটিয়ে সে হলো দূত। দূত হত্যা মহাপাপ। দূত আসছে সন্ধি করতে, মানে যুদ্ধ শেষ-বাড়ি ফেরার ডাক, টেস্ট ম্যাচের ড্র ফলাফল এর মতো। দূত এসে চুক্তি করত, তার রাজা কত শত হাতি দেবে, কত হাজার ঘোড়া দেবে, কত উটের পিঠভর্তি স্বর্ণ দেবে, রৌপ্য দেবে, হাতির মূল্যবান দাঁত দেবে ইত্যাদি।
অর্থাৎ মধ্যযুগীয় যুদ্ধে হয় জয়, নয় পরাজয়, নয় সন্ধি এই তিনটার একটা হত। লড়াইটা হত একটা ময়দানে, সৈন্যের বাইরে সাধারণ মানুষ নিজের দৈনন্দিন জীবন যাপন করত নিজের মতো করে, যেন কিছুই চলছে না। সেইসময় রাজা-সৈন্যদের পায়ের নিচের ঘাস, উলুখাগড়ার বনই শুধু পিষ্ঠ হত, সাধারণ মানুষের কিছুই হত না। এজন্যই প্রবাদ এসেছে, রাজায় রাজায় লড়াই হয়, উলুখাগড়ার প্রাণান্ত।
এরপর এলো আধুনিক যুগ। যুদ্ধ একটা একক ময়দান থেকে ছড়িয়ে পড়ল জলে, স্থলে, আকাশে। রকেট বৃষ্টি ও মিসাইল- এরা তো আর সৈন্য চেনে না, গিয়ে পড়তে লাগল এখানে সেখানে। প্রচুর সিভিলিয়ান আহত-নিহত হতে লাগল। বোম্বিং হয় হাসপাতালে, স্কুল-কলেজেও। মধ্যযুগে যুদ্ধে পরাজিত হলেই কেবল নারী-শিশুদের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে দখল করে নিয়ে যাওয়া হত, অন্যথায় সৈন্যশিবিরে তাদের উপর আক্রমণ করাকে কাপুরুষোচিত গণ্য করা হত, কোনো রাজাই এমন কিছু করে ধিক্কার শুনতে চাইতেন না।
কিন্তু অধুনাকালিক বর্বরতার কাছে হার মানল সমরের তাবৎ অমর সেইসব রীতি। নারী মরে, শিশু মরে, ধ্বংস হয় লোকালয়। পারমাণবিক বোমা, ব্যালাস্টিক ও অ্যান্টি ব্যালাস্টিক মিসাইল, জীবাণু বোমা, নাপাম বোমা (মানুষ মারে কিন্তু অবকাঠামো ধ্বংস করে না, কারণ অবকাঠামোর দাম মানুষের জীবনের চেয়েও বেশি) আরও কত কী!
সিভিলিয়ানদের বাঁচাতে তৈরি হলো জাতিসংঘ, জেনেভা কনভেনশন ইত্যাদি। কিন্তু যারা এগুলো তৈরি করেছিল তাদের জন্য এইসব নিয়ম প্রযোজ্য নয়। অধুনা সমরের সবচেয়ে খারাপ জিনিসটা হলো যুদ্ধবিরতি।
আগে যুদ্ধ হলে জয়-পরাজয়-সন্ধির ফলে যুদ্ধ মিটে যেত, কিন্তু এখন কোনোপক্ষই পরাজয় স্বীকার করতে চায় না, সন্ধিকেও মনে করে অপমানের। ফলে এখন সিজফায়ার বা যুদ্ধবিরতির নামে চলে সাময়িক অবকাশ, যে অবকাশের আড়ালে চলে আবারও নতুন করে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি। যেহেতু পরাজয়ের গ্লানি নেই, তাই যুদ্ধের কোনো সমাপ্তিও নেই আধুনিক যুগে। এক অন্তহীন যুদ্ধের মুখে বিশ্ব। দুইটি দেশ লড়াই করলে এর পরিণাম আর উলু খাগড়া নয়, ভোগ করে সারা বিশ্ব। এহেন পরিস্থিতিতে মধ্যযুগীয় বর্বরতা শব্দটা হাস্যকর নয় কি?