
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই শান্তির প্রতি ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি বজায় রেখে, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি—ফ্রান্স ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে।”
এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ফ্রান্স হতে যাচ্ছে ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং বৃহৎ রাষ্ট্র, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে। এর আগে নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড এবং স্পেন এ ধরনের উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেছিল।
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ইতোমধ্যে ১৪২টি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং জার্মানি—এই তিনটি প্রভাবশালী পশ্চিমা রাষ্ট্র এখনও স্বীকৃতি দেয়নি।
এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে যখন গাজায় চলমান ইসরায়েলি অভিযানে ৫৯,৫৮৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে এবং সহায়তা সরবরাহে কঠোর বাধার কারণে চরম খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং আরও ২১টি দেশ একটি যৌথ বিবৃতিতে গাজার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই যুদ্ধ এখনই বন্ধ হওয়া উচিত।”
ম্যাক্রোঁ তাঁর ঘোষণার সঙ্গে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের উদ্দেশে লেখা একটি চিঠিও প্রকাশ করেছেন, যেখানে তিনি তাঁর এই অভিপ্রায় ব্যাখ্যা করেছেন। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে উপ-সভাপতি হুসেইন আল-শেইখ ফরাসি প্রেসিডেন্টের এই অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ফ্রান্সের প্রতিশ্রুতি এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারে তাদের সমর্থনের প্রতিফলন।”
হামাসও ম্যাক্রোঁর ঘোষণাকে “ইতিবাচক অগ্রগতি” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং অন্যান্য দেশগুলোকে একই পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ইতিহাসে দেখা যায়, ১৯৮৮ সালে প্রথম ইন্তিফাদার সময় ইয়াসির আরাফাত একতরফাভাবে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন। সে সময় আলজেরিয়া প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং এরপর মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বহু দেশ এই স্বীকৃতি দেয়।
তবে এখনও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা হলো ইসরায়েলের দখলদারিত্ব। ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমসহ পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রেখেছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে বেআইনি। সম্প্রতি ইসরায়েলি পার্লামেন্ট একটি প্রতীকী প্রস্তাব পাশ করেছে, যেখানে পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংযুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।
ম্যাক্রোঁর ঘোষণার তীব্র বিরোধিতা করেছে ইসরায়েল। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর দপ্তর এক বিবৃতিতে বলে, “এই সিদ্ধান্ত সন্ত্রাসকে পুরস্কৃত করবে এবং গাজায় যেমন হয়েছে, তেমনি আরেকটি ইরানি উপনিবেশ তৈরির ঝুঁকি তৈরি করবে।” ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ একে “লজ্জাজনক এবং সন্ত্রাসের কাছে আত্মসমর্পণ” বলে মন্তব্য করেছেন।
এদিকে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানান, তিনি ফ্রান্স ও জার্মানির সঙ্গে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি ফোনালাপে অংশ নেবেন এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধানের পথে এগোনোর আহ্বান জানাবেন।