
নিউইয়র্ক সিটিতে নতুন ইতিহাস গড়লেন জোহরান মামদানি। ৩৪ বছর বয়সী এই তরুণ রাজনীতিক শহরের প্রথম মুসলিম, প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত ও ১৮৯২ সালের পর সর্বকনিষ্ঠ মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো ও রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস সিলওয়াকে পরাজিত করেন। প্রায় নাম না থাকা, অল্প তহবিল ও দলীয় মনোনয়ন ছাড়া লড়েই এই জয় এনে দেন মামদানি।
দ্য গার্ডিয়ান ও পিবিএসের খবরে জানা যায়, ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল শাখার ঘনিষ্ঠ এই নেতা ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, যেখানে কুওমো পেয়েছেন ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি এক রাজনৈতিক বিস্ময়— কারণ প্রচলিত রাজনীতির বাইরে থেকে উঠে এসে তিনি নিউইয়র্কের মতো জটিল ও প্রভাবশালী শহরের নেতৃত্বে পৌঁছে গেছেন।

মামদানি দীর্ঘদিন ধরেই প্রগতিশীল নীতির পক্ষে সোচ্চার। তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ছিল বিনামূল্যে শিশু যত্ন, সাশ্রয়ী গণপরিবহন, রেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং ধনীদের ওপর কর বৃদ্ধি। এসব ইস্যু তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের কাছে তার অবস্থানকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায়ও বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন, যা তাকে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
তবে এখন তার সামনে বাস্তব চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। রাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হোচুল ইতোমধ্যে কর বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরোধিতা জানিয়েছেন, ফলে মামদানির উচ্চাভিলাষী নীতি বাস্তবায়ন রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া সম্ভব নয়। এছাড়া নিউইয়র্কের প্রশাসনিক কাঠামো, বাজেট ঘাটতি এবং বিভিন্ন চাপগ্রস্ত খাতের সংকট তাকে শুরু থেকেই পরীক্ষা দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলবিরোধী মন্তব্য এবং নেতানিয়াহুর নীতির কড়া সমালোচনা করে তিনি আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত হন। তার এসব অবস্থান ভবিষ্যতে কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। অন্যদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতারা ইতিমধ্যে তাকে “সমাজতান্ত্রিক হুমকি” আখ্যা দিয়েছেন এবং শহরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোতে তীব্র সমালোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবুও জয়ের পর মামদানি উদ্দীপ্ত কণ্ঠে বলেন, “আমাদের লক্ষ্য কেবল রাজনীতি নয়; আমরা লড়ছি শ্রমজীবী মানুষের জীবনের জন্য।” তার এই বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় তৃণমূল মানুষের প্রতি প্রতিশ্রুতির সুর। বিল ডি ব্লাসিওর মতো তিনিও আদর্শবাদী প্রত্যাশা নিয়ে মেয়র কার্যালয়ে যাচ্ছেন, তবে নিউইয়র্কের বাস্তবতা যে অনেক কঠিন— তা তিনি জানেন বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচনে নিউইয়র্ক শুধু একজন নতুন মেয়র বেছে নেয়নি, বরং এক নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তির উত্থান প্রত্যক্ষ করেছে। এখন মামদানির দায়িত্ব নিজেকে কেবল বামপন্থী প্রতীক নয়, বরং বাস্তববাদী প্রশাসক হিসেবে প্রমাণ করা। শহরের ব্যয়বৃদ্ধি, বাসস্থান সংকট ও সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে তিনি কতটা কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারেন— সেটিই হবে তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।