রাষ্ট্রীয় নির্দেশে যাত্রাবাড়ী গণহত্যা - শেখ হাসিনার অডিও ও ৫২ লাশের সন্ধান দিলো বিবিসি - দৈনিক সাবাস বাংলাদেশ
নোটিশ:
শিরোনামঃ
মনোনয়ন বিতরণের শেষদিনে রাকসু কার্যালয়ে ভাঙচুর করল রাবি ছাত্রদল পাগলা মসজিদের দানবাক্সে রেকর্ড ১২ কোটি ৯ লাখ টাকা তাসকিন–লিটনের ঝড়ে ডাচদের সহজে হারাল বাংলাদেশ, সিরিজে ১–০ নেতৃত্ব সাবেক ভিপি নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে কুড়িগ্রামে বিক্ষোভ কেরালায় ক্যানারা ব্যাংকে গরুর মাংস নিষিদ্ধ, কর্মীদের ‘বিফ-ফেস্ট’ প্রতিবাদ ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম: জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধসহ তিন দফা দাবিতে গণঅধিকার পরিষদের হুঁশিয়ারি ভিপি নূরের ওপর হামলা সেনা নেতৃত্বে: পিনাকী যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা: ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের জাতিসংঘে যোগ দেওয়ার পথ বন্ধ নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর সন্ধানের দাবিতে ইবিতে ছাত্রশিবিরের মানববন্ধন কিশোরগঞ্জ পাগলা মসজিদের দানবাক্সতে ৩২ বস্তা টাকা ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা সহ নানান চিরকুট

রাষ্ট্রীয় নির্দেশে যাত্রাবাড়ী গণহত্যা – শেখ হাসিনার অডিও ও ৫২ লাশের সন্ধান দিলো বিবিসি

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় বুধবার, ৯ জুলাই, ২০২৫
  • ৯৫ বার দেখা হয়েছে
পাঁচই অগাস্ট দুপুরে ধারণ করা যাত্রাবাড়ী এলাকার ড্রোন ভিডিও

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিভীষিকাময় দিন ছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। সেই দিন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশ বাহিনীর নির্বিচার গুলিতে প্রাণ হারান অন্তত ৫২ জন সাধারণ মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে এই ঘটনার প্রকৃত বিবরণ জানতে পারছিল না কেউ। তবে সম্প্রতি বিবিসির একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে সেই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের বিস্তারিত তথ্য। বিবিসি জানায়, টানা ৩৬ দিন ধরে চলা সরকারবিরোধী ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের শেষ দিনে, যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে পালিয়ে যান, তখন এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

বিবিসি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৫ আগস্ট দুপুরে যাত্রাবাড়ী থানার সামনের সড়কে আন্দোলনকারীরা অবস্থান করছিলেন। বিকেল ২টা ৪৩ মিনিটে সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করলে হঠাৎ করে থানার ভেতর থেকে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা মেশিনগান দিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করে। পুরো ঘটনা মোবাইলে ধারণ করছিলেন আন্দোলনকারী মিরাজ হোসেন, যিনি পুলিশের গুলিতে সেদিন নিহত হন। তার পরিবারের সদস্যরা পরবর্তীতে ফোনটি খুঁজে পান এবং বিবিসির হাতে তুলে দেন। এই ভিডিওর মেটাডেটা বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ওইদিন ঠিক ২টা ৪৩ মিনিটে গুলি শুরু হয়েছিল।

ঘটনার সময় থানার উল্টো দিকে থাকা একটি ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ এবং ড্রোন ভিডিও বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্কিত মানুষজন গলির ভেতর দিয়ে পালানোর চেষ্টা করছেন। সেই সময় আহত আন্দোলনকারীদের শরীরে লাথি মারতেও দেখা যায় পুলিশকে। এই হত্যাকাণ্ড সেদিন থেমে থাকেনি। ড্রোন ফুটেজের মাধ্যমে দেখা যায়, বিকেল ৩টা ১৭ মিনিট পর্যন্ত টানা গুলিবর্ষণ চলতে থাকে। মহাসড়কের ওপর রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়ে থাকে। আহতদের ভ্যান, রিকশা এবং মোটরসাইকেলে করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন আন্দোলনকারীরা।

যাত্রাবাড়ী থানার গাড়িগুলোর রং ও অবস্থান

যাত্রাবাড়ী থানার গাড়িগুলোর রং ও অবস্থান

বিকেলের দিকে আন্দোলনকারীদের একটি দল শাহবাগের দিকে সরে গেলেও যাত্রাবাড়ীতে যারা থেকে যান, তাদের মধ্যে অনেকেই থানার ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে কমপক্ষে ছয়জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে প্রথম দিকে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। তবে বিবিসি তাদের অনুসন্ধানে হাসপাতালে নেওয়া আহতদের তালিকা, নিহতদের পরিবারের সাক্ষাৎকার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত হয়েছে, ওইদিন পুলিশের গুলিতে অন্তত ৫২ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।

অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, যাত্রাবাড়ী গণহত্যার ঘটনায় একটি ভাইরাল ভিডিও ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছিল। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিওটিকে পাঁচই আগস্টের ঘটনার ভিডিও বলে দাবি করা হলেও বিবিসি নিশ্চিত করে যে, সেটি ছিল ৪ আগস্টের। ওইদিনও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল পুলিশ। বিবিসি পাঁচই আগস্টের ড্রোন ভিডিও, সিসিটিভি এবং ভাইরাল ভিডিও মিলিয়ে দেখে নিশ্চিত হয় যে, ৪ আগস্টের ভিডিওতে থানার সামনে থাকা গাড়িগুলোর রং ও অবস্থান, মেশিনগানের গুলির শব্দ এবং ট্রাক থেকে বের হওয়া ধোঁয়ার দৃশ্য পাঁচই আগস্টের ফুটেজের সঙ্গে মেলেনি।

বিবিসির অনুসন্ধানের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আদেশ সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ডিং। যেখানে তাকে এক অজ্ঞাত সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে শোনা যায়। রেকর্ডিংয়ে শেখ হাসিনা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “তারা (পুলিশ) যেখানেই পাবে, গুলি করবে।” এই অডিও ১৮ জুলাই সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে করা হয়েছিল বলে জানায় সূত্র। ব্রিটিশ ফরেনসিক অডিও বিশ্লেষক সংস্থা ইয়ারশট এবং বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি অডিওটির সত্যতা নিশ্চিত করে। অডিওর শব্দতরঙ্গ, স্বরের ভিন্নতা, শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ, ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ এবং ইলেকট্রিক নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি বিশ্লেষণ করে তারা নিশ্চিত হয়, এটি কোনোভাবে এডিট করা হয়নি এবং কৃত্রিমও নয়।

এই ভয়াবহ ঘটনার পর তৎকালীন যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ বিবিসিকে জানিয়েছে, তারা এই ঘটনায় জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ শুরু করেছে। অন্যদিকে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য জানতে চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

বিবিসি অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ২০৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৩ জন ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার হয়েছে। মানবাধিকার আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান বিবিসিকে বলেন, “এই রেকর্ডিং শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ আদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। আদালতে এই প্রমাণ উপস্থাপন করা হলে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “বিবিসির উল্লেখ করা টেপ রেকর্ডিংটি সত্য কিনা আমরা নিশ্চিত নই। তবে বেআইনি কিছু করা হয়নি।” যদিও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছে।

২০২৪ সালের এই হত্যাকাণ্ড শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এই অনুসন্ধান একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ, তেমনি গণবিক্ষোভ দমনে কীভাবে সরকারি বাহিনীকে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তার অকাট্য দলিল হয়ে থাকলো।

শেয়ার করুন

Comments are closed.

এই ধরনের আরও নিউজ

© কপিরাইট ২০২৪-২০২৫ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: NagorikIT