কিংবদন্তি লালনশিল্পী ফরিদা পারভীন আর নেই

- আপডেট সময় শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
- ৩৩৭ বার দেখা হয়েছে


দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৭১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ‘লালনকন্যা’ ফরিদা পারভীন; পাঁচ দশকের সংগীতজীবনে অমর করলেন অচিন পাখির গান।
লালনগীতির অমর সাধক, কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন আর নেই। শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।
ফরিদা পারভীন দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। ২ সেপ্টেম্বর ডায়ালিসিস শেষে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শুরুর দিকে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। অবস্থার আরও অবনতি হলে ১০ সেপ্টেম্বর থেকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানান, মাল্টি-অর্গান ফেলিওর ও দীর্ঘস্থায়ী জটিলতার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন ফরিদা পারভীন। শৈশব কাটে কুষ্টিয়ায়। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি তার ঝোঁক ছিল প্রবল। মাত্র ১৪ বছর বয়সে, ১৯৬৮ সালে, রাজশাহী বেতারে নজরুলগীতি গেয়ে তার পেশাদার সংগীতজীবনের সূচনা হয়। শুরুতে দেশাত্মবোধক গান ও নজরুলগীতি গাইলেও ধীরে ধীরে নিজেকে লালনসংগীতের সঙ্গে একাত্ম করেন।
পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশন ও অডিওতে গানে গানে দর্শক-শ্রোতাকে মুগ্ধ করেছেন তিনি। তার কণ্ঠে ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’, ‘মিলন হবে কত দিনে’, ‘তোমার বাঁশির সুরে’, ‘তুমি জানো না রে প্রিয়’সহ অসংখ্য গান বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছে। এ কারণে তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন “লালনকন্যা” নামে।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৭ সালে একুশে পদক লাভ করেন ফরিদা পারভীন। ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে সম্মানিত হন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার অবদান স্বীকৃতি পেয়েছে; ২০০৮ সালে জাপান সরকার তাকে ফুকুওকা এশিয়ান কালচারাল পুরস্কারে ভূষিত করে।
ফরিদা পারভীন শুধু গান গেয়েই থেমে থাকেননি, তিনি লালনের দর্শন ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে উদ্যোগী ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত ‘অচিন পাখি স্কুল’-এ শিশু-কিশোরদের লালনের গান ও দর্শন শেখানো হতো। এর মাধ্যমে তিনি একাধারে সংগীতশিল্পী ও সাংস্কৃতিক শিক্ষক হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন।
সর্বজনপ্রিয় এই শিল্পী মৃত্যুকালে স্বামী ও চার সন্তান রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে সংগীতাঙ্গনসহ সর্বস্তরে শোক নেমে এসেছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ বলছেন, ফরিদা পারভীনের চলে যাওয়া শুধু একজন শিল্পীর প্রয়াণ নয়; এটি একটি যুগের অবসান।






Leave a Reply