চশমায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়া: সুবিধা, নাকি গোপন নজরদারির ঝুঁকি?

- আপডেট সময় মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- ৮২ বার দেখা হয়েছে


দেখতে অনেকটাই সাধারণ চশমার মতো। অথচ ফ্রেমের ভেতরে বসানো আছে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, স্পিকার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ব্যবহারকারী হাত না বাড়িয়েই কল করতে পারেন, সামনে থাকা লেখা শুনতে পারেন, ভাষা অনুবাদ করতে পারেন কিংবা মুহূর্তের মধ্যে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে পারেন। সুবিধার এই দীর্ঘ তালিকার পাশাপাশি এআই স্মার্ট চশমা এখন ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য নতুন উদ্বেগও তৈরি করছে। কারণ সামনে থাকা মানুষটি সব সময় বুঝতে নাও পারেন যে তাকে রেকর্ড করা হচ্ছে।
ছোট ফ্রেমে বড় প্রযুক্তি
স্মার্ট চশমার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। মেটার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির তৈরি ৭০ লাখের বেশি স্মার্ট চশমা বিক্রি হয়েছে। কয়েক শ পাউন্ড মূল্যের এসব চশমা দিয়ে ফ্রেম স্পর্শ করে ছবি তোলা বা ভিডিও করা যায়। কণ্ঠনির্দেশের মাধ্যমে এআই সহকারীর সঙ্গে কথা বলা, পথনির্দেশ নেওয়া এবং আশপাশের বস্তু শনাক্ত করার মতো সুবিধাও এতে যুক্ত হয়েছে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, এটি ভবিষ্যতের ব্যক্তিগত কম্পিউটিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। ফোন হাতে না নিয়েই প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া এবং দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ ব্যবহারকারীর জীবনকে সহজ করতে পারে। কিন্তু ক্যামেরাটি চশমার ফ্রেমে খুব ছোট করে বসানো থাকায় সাধারণ মোবাইল ফোনের তুলনায় রেকর্ডিং শনাক্ত করা কঠিন। এখানেই আপত্তির শুরু।
আলো জ্বললেই কি সম্মতি দেওয়া হয়?
রেকর্ডিং চলার সময় মেটার স্মার্ট চশমায় একটি ছোট সাদা আলো জ্বলে। ওই আলো ঢেকে বা নষ্ট করার চেষ্টা করা হলে ক্যামেরা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও যুক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মেটা বলছে, ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি পণ্য তৈরির শুরু থেকেই বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
তবে অধিকারকর্মীদের বক্তব্য, ছোট একটি আলো দেখা আর ছবি বা ভিডিও ধারণে সম্মতি দেওয়া এক বিষয় নয়। কেউ আলোটি খেয়াল করলেও সেই ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছাবে কি না, তা তিনি জানতে পারেন না। স্মার্ট চশমা ব্যবহার করে পথচারী—বিশেষ করে নারীদের—অজান্তে ধারণ করা ভিডিও অনলাইনে প্রকাশের অভিযোগও উঠেছে। কিছু কনটেন্ট নির্মাতা রাস্তায় অপরিচিত নারীর সঙ্গে কথা বলে তাঁদের প্রতিক্রিয়া গোপনে রেকর্ড করে প্রকাশ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিভিন্ন দেশে বাড়ছে কড়াকড়ি
ব্রিটিশ পাব পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েদারস্পুন তাদের প্রায় ৮০০ প্রতিষ্ঠানে স্মার্ট চশমা দিয়ে ভিডিও ধারণ নিষিদ্ধ করেছে। কয়েকটি সিনেমা হল ও অনুষ্ঠান আয়োজক প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ছোট ক্যামেরাটি গোপন নজরদারি বা অনুমতিবিহীন রেকর্ডিংয়ে ব্যবহৃত হতে পারে।
ফ্রান্সে স্মার্ট চশমা ব্যবহার করে নারীদের অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ ও অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে যৌন হয়রানিসংক্রান্ত তদন্ত শুরু হয়েছে। দেশটির তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ কর্মক্ষেত্রে এ ধরনের চশমার ব্যবহার নিয়ে একাধিক অভিযোগ পেয়েছে। অস্ট্রেলিয়াও সরকারি দপ্তরে ক্যামেরাযুক্ত স্মার্ট চশমা নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
অনেক দেশে প্রকাশ্য স্থানে ছবি বা ভিডিও ধারণ নিজেই অপরাধ নয়। তবে সেই রেকর্ডিং হয়রানি, অনুসরণ, যৌন নিপীড়ন, গোপনীয়তা লঙ্ঘন বা ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত হলে প্রচলিত আইন কার্যকর হতে পারে। সমস্যা হলো, প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বদলাচ্ছে, কিন্তু আইন ও সামাজিক আচরণবিধি একই গতিতে হালনাগাদ হচ্ছে না।
শুধু ঝুঁকি নয়, আছে গুরুত্বপূর্ণ উপকারও
স্মার্ট চশমাকে একতরফাভাবে ক্ষতিকর বলার সুযোগ নেই। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীর সামনে থাকা লেখা পড়ে শোনানো, কোনো বস্তু শনাক্ত করা এবং পথ চলায় সহায়তা করার ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের যোগাযোগেও তা সহায়ক হতে পারে। বয়স্ক মানুষ কিংবা স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করার জন্যও স্মার্ট চশমা নিয়ে পরীক্ষা চলছে।
যুক্তরাজ্যের তথ্য কমিশনারের দপ্তর বলেছে, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ নতুন নয়; স্মার্টফোনে এগুলো বহুদিন ধরেই আছে। পার্থক্য হলো, প্রযুক্তিগুলো এখন আরও ছোট, সস্তা ও সারাদিন পরার উপযোগী যন্ত্রে চলে এসেছে। ফলে ভালো ও ক্ষতিকর—দুই ধরনের ব্যবহারই দ্রুত বাড়তে পারে।
প্রয়োজন স্পষ্ট নিয়ম ও দায়িত্বশীল ব্যবহার
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাধান শুধু যন্ত্র নিষিদ্ধ করা নয়। রেকর্ডিংয়ের সংকেত আরও স্পষ্ট করা, সংবেদনশীল স্থানে ব্যবহার সীমিত রাখা, অনুমতি ছাড়া ধারণ করা কনটেন্ট দ্রুত সরানো এবং অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকেও নতুন ফিচারের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার সুরক্ষায় বিনিয়োগ করতে হবে।
এআই স্মার্ট চশমা মানুষের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়াতে পারে, আবার একই প্রযুক্তি অদৃশ্য নজরদারির হাতিয়ারও হতে পারে। শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিটি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ভর করবে ব্যবহারকারী, নির্মাতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সুবিধা ও ব্যক্তিগত অধিকারের মধ্যে কতটা ভারসাম্য রাখতে পারে তার ওপর।
তথ্যসূত্র: BBC News বাংলা, Reuters ও যুক্তরাজ্যের Information Commissioner’s Office (ICO)।






Leave a Reply