
কিশোরগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র পুরান থানা এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক শহীদি মসজিদে টানা ২৬ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে খতম তারাবিহ পড়াচ্ছেন হাফেজ মাওলানা মাহফুজুর রহমান (৫৬)।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতি বহনকারী এ মসজিদে রমজান এলেই তার তিলাওয়াতে মুখরিত হয় প্রাঙ্গণ, সমাগম ঘটে প্রায় ১০ হাজার মুসল্লির।
জেলার কেন্দ্রীয় মসজিদ হিসেবে পরিচিত শহীদি মসজিদের পূর্বনাম ছিল পুরান থানা মসজিদ। ১৯৪২ সালের ২৪ অক্টোবর মসজিদের ভেতরে ব্রিটিশ সেনাদের অতর্কিত হামলা ও গুলিবর্ষণে পাঁচজন মুসল্লি শহীদ হন। সেই ঘটনার পর থেকেই নামকরণ হয় ‘শহীদি মসজিদ’। ঐতিহাসিক এই মসজিদের তিনটি পিলারে এখনো দৃশ্যমান গুলির চিহ্ন—যা স্বাধীনতার সংগ্রামের নীরব সাক্ষী।
১৯৮২ সালে মসজিদসংলগ্ন আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়া হিফজুল কোরআন বিভাগ থেকে মাত্র এক বছরে পবিত্র কোরআন হিফজ সম্পন্ন করেন মাহফুজুর রহমান। ১৯৯৩ সালে তিনি আল্লামা হাফেজ মাওলানা আজহার আলী আনোয়ার শাহের পেছনে সাধারণ মুসল্লি হিসেবে তারাবিহ পড়ছিলেন। একদিন তিলাওয়াতে সংশোধনের জন্য লোকমা দিলে তার কণ্ঠে নজর পড়ে ইমামের। নামাজ শেষে তাকে ডেকে ইমামের পেছনে দাঁড়িয়ে শ্রবণকারীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। টানা আট বছর সে দায়িত্ব পালনের পর ২০০১ সাল থেকে শুরু করেন খতম তারাবিহ পড়ানো।
এই মসজিদে একাধারে ৪২ বছর খতম তারাবিহ পড়িয়ে নজির গড়েছিলেন আনোয়ার শাহ। তার উত্তরসূরি হিসেবে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করছেন মাহফুজুর রহমান।
বর্তমানে প্রথম ছয় রাকাত নামাজ পড়ান মাহফুজুর রহমান। বাকি অংশ আদায় করেন হাফেজ মাহমুদুল হাসান, হাফেজ মোহাম্মদ সফিউল্লাহ ও হাফেজ আতহার রাসেল। চারজনই বিনা পারিশ্রমিকে ইমামতি করেন; মসজিদ কমিটি সম্মানী দিতে চাইলেও তারা নেন না।
মাহফুজুর রহমান বলেন, আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত, ওস্তাদদের দোয়া ও মুসল্লিদের ভালোবাসায় সুস্থ থেকে দীর্ঘদিন একই মসজিদে তারাবিহ পড়ানোর তৌফিক পেয়েছেন। “দুই প্রজন্মকে তিলাওয়াত শোনাতে পেরেছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি,”—যোগ করেন তিনি।
শহীদি মসজিদের মোতোয়ালি ও আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা শাব্বির আহমাদ জানান, জুমা ও তারাবিহতে আশপাশসহ দূর-দূরান্ত থেকে প্রায় ১০ হাজার মুসল্লির সমাগম ঘটে। তার ভাষায়, “হাফেজ মাহফুজুর রহমানের তিলাওয়াত শ্রুতিমধুর ও শুদ্ধ। যতদিন তিনি সক্ষম থাকবেন, ততদিন এখানেই তারাবিহ পড়াবেন—এটাই সবার চাওয়া।”
নিয়মিত মুসল্লি হাবিবুর রহমান বলেন, “আমি কয়েক বছর ধরে এখানে তারাবিহ পড়ছি, এখন আমার ছেলেও পড়ে। হাফেজ সাহেবের তিলাওয়াত অত্যন্ত স্পষ্ট ও হৃদয়গ্রাহী।”
কিশোরগঞ্জ শহরের চর শোলাকিয়া এলাকার মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে মাহফুজুর রহমান এক মেয়ে ও দুই ছেলের জনক। তার দুই ছেলে হুজাইফা ও মুয়াজও হাফেজ। দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করার পাশাপাশি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতকোত্তর করেছেন তিনি। বর্তমানে মিফতাহুল উলুম মহিলা মাদ্রাসার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যতদিন সুস্থ থাকব, পবিত্র কোরআনের খেদমতের মাধ্যমেই বাকি জীবন কাটাতে চাই।”