নোটিশ:
শিরোনামঃ
নানিয়ারচরে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ দিল সেনাবাহিনী জ্বালানি স্থাপনায় যুদ্ধবিরতির দাবি ট্রাম্পের, হামলা অব্যাহত থাকার কথা কিয়েভের জ্বালানি মূল্য ও ঋণের চাপ সামনে রেখে ব্যাংককে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বৈঠক দেশে চিকিৎসার মান বাড়লে বিদেশমুখিতা কমবে: রাষ্ট্রপতি মেয়েশিশুর শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যয় নিশ্চিতের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর আইটি, সার ও জ্বালানি খাতে জাপানের মারুবেনিকে বিনিয়োগের আহ্বান সমুদ্র, নদী ও স্থলবন্দরের সমন্বয়ে জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়ন হচ্ছে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত, নিন্দা ঢাকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের কথা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

খালেদা জিয়ার মৃত্যু কি ‘স্লো পয়জনিং’? বিস্ফোরক অভিযোগ জানালেন ব্যক্তিগত চিকিৎসক দলের প্রধান অধ্যাপক

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় শনিবার, ১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২৮৫ বার দেখা হয়েছে
ডা. এফ এম সিদ্দিকী

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু কি কেবল বার্ধক্য ও অসুস্থতার স্বাভাবিক পরিণতি ছিল, নাকি এটি ছিল পরিকল্পিত ‘স্লো পয়জনিং’? এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা, লিভারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ প্রয়োগ এবং বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি না দেওয়ার ধারাবাহিক সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। দীর্ঘদিনের জটিল অসুস্থতা, কারাবাস ও গৃহবন্দিত্বের কষ্ট এবং মৃত্যুর আগে টানা এক মাসেরও বেশি সময় হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকার পর তার এই বিদায় জাতিকে গভীর শোকে আচ্ছন্ন করে।

তবে শোকের আবহ কাটতে না কাটতেই জনমনে দানা বাঁধতে শুরু করে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন—তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী কি স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরণ করেছেন, নাকি এই মৃত্যুর পেছনে ছিল সুপরিকল্পিত কোনো অদৃশ্য নীল নকশা?

গত শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক নাগরিক শোকসভায় দেওয়া বক্তব্যে বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী এই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেন।

তার ভাষায়, বেগম খালেদা জিয়াকে পরিকল্পিতভাবে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে এমন একটি ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছে, যা তার শারীরিক অবস্থার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এই প্রক্রিয়াকেই তিনি রূপক অর্থে ‘স্লো পয়জনিং’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

ডা. সিদ্দিকী তার বক্তব্যে সুনির্দিষ্টভাবে ‘মেথোট্রেক্সেট’ নামের একটি ওষুধের কথা উল্লেখ করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে মেথোট্রেক্সেট একটি শক্তিশালী ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট ও কেমোথেরাপি ড্রাগ, যা সাধারণত রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

দীর্ঘদিন ধরে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত বেগম খালেদা জিয়ার জয়েন্টে তীব্র ব্যথা ও কার্যক্ষমতার অবনতি ঘটেছিল। সেই চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাকে এই ওষুধ দেওয়া হচ্ছিল।

তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা অনুযায়ী, মেথোট্রেক্সেট ব্যবহারের আগে ও ব্যবহারের পুরো সময়জুড়ে রোগীর লিভার ফাংশন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা বাধ্যতামূলক। কারণ, এই ওষুধটি অত্যন্ত হেপাটোটক্সিক—অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে যকৃতের মারাত্মক ক্ষতি করতে সক্ষম।

ডা. সিদ্দিকীর অভিযোগ, বেগম খালেদা জিয়া আগে থেকেই ফ্যাটি লিভার ডিজিজে আক্রান্ত ছিলেন। এ অবস্থায় মেথোট্রেক্সেট ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন হলেও তা মানা হয়নি।

লিভার ফাংশন টেস্টের রিপোর্ট খারাপ আসার পরও তৎকালীন সরকারি চিকিৎসকরা এই ওষুধ বন্ধ করেননি। ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত একজন রোগীকে নিয়মিত মেথোট্রেক্সেট দিলে তা দ্রুত লিভার সিরোসিসে রূপ নিতে পারে বলে জানান তিনি।

বেগম খালেদা জিয়ার প্রকৃত শারীরিক অবস্থা দেশবাসীর সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে, যখন তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন।

ডা. সিদ্দিকীর ভাষ্যমতে, তখন নতুন মেডিকেল বোর্ড তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা বিস্মিত হন। বিএসএমএমইউ থেকে দেওয়া ছাড়পত্রে তার লিভারের মারাত্মক অবস্থার কোনো উল্লেখ ছিল না।

পরবর্তী পরীক্ষায় ধরা পড়ে, মেথোট্রেক্সেটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে তার ফ্যাটি লিভার ইতোমধ্যে লিভার সিরোসিসে রূপ নিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের সর্বোচ্চ একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বলেন, দীর্ঘমেয়াদে হাই ডোজে মেথোট্রেক্সেট ব্যবহার করলে ফ্যাটি লিভার থেকে সিরোসিসে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছে, তা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়।

বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা যখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তখন তার মেডিকেল বোর্ড বারবার যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা জার্মানিতে উন্নত চিকিৎসার সুপারিশ করে।

বিএনপি ও পরিবারের পক্ষ থেকে অন্তত ২৭ বার বিদেশে চিকিৎসার আবেদন করা হলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিবারই আইনি জটিলতার কথা বলে তা প্রত্যাখ্যান করে। বিশেষজ্ঞরা একে ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলা’ বা wilful negligence হিসেবে দেখছেন।

ডা. সিদ্দিকী দাবি করেছেন, বিএসএমএমইউতে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত সব নথি অবিলম্বে জব্দ করে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার দাবিও উঠেছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “আমরা বরাবরই বলে এসেছি, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে বেগম খালেদা জিয়াকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত হলেই সত্য বেরিয়ে আসবে।”

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু নিয়ে ওঠা ‘স্লো পয়জনিং’-এর অভিযোগ এখন আর শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। একজন চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট ওষুধ, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও চিকিৎসা নথির প্রসঙ্গ তুলে ধরা এই অভিযোগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

এই মৃত্যু যদি চিকিৎসায় অবহেলা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল হয়ে থাকে, তবে তা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ রাজনৈতিক অপরাধ—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরও নিউজ

© কপিরাইট ২০২৪-২০২৫ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: NagorikIT