চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে মঙ্গলবার (২২ জুলাই) রাতে হাতির পাল রেললাইনে ওঠায় থেমে যায় কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা সৈকত এক্সপ্রেস। হুইসেল দেওয়ার পর হাতিরা সরে গেলেও একটি হাতি ট্রেনের একটি বগিতে ধাক্কা দেয়। এতে অন্তত ৫০০ যাত্রী নিয়ে চলা ট্রেনে মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে চালক ও গার্ডের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায় ট্রেনটি।
ঘটনাটি ঘটে রাত সাড়ে ১০টার দিকে। কক্সবাজার থেকে ট্রেনটি রাত পৌনে ৯টায় ছাড়ার কথা থাকলেও প্রায় ৫০ মিনিট বিলম্বে ছাড়ে। নির্ধারিত গতিসীমা অনুযায়ী চুনতি অভয়ারণ্যে ট্রেন প্রবেশের পর ঘণ্টায় ২০ কিমি গতিতে এগোতে থাকে। চালক আবদুল আউয়াল হেডলাইটের আলোয় রেললাইনের উপর হাতির দল দেখতে পেয়ে ব্রেক করতে থাকেন এবং এক পর্যায়ে জরুরি ব্রেক চেপে ট্রেন থামিয়ে দেন।
চালক বলেন, “হাতি ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসার পর আমি দ্রুত ব্রেক চাপি। আমরা একদম কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম, কিন্তু হাতির গায়ে না লেগেই ট্রেন থেমে যায়। এরপর ঘনঘন হুইসেল দিলে হাতিরা নিচে নেমে যায়।”
তবে হাতিরা সরে যাওয়ার পর হঠাৎ গার্ড সাখাওয়াত হোসেনের কাছ থেকে খবর আসে, একটি হাতি ট্রেনের বগিতে ধাক্কা দিচ্ছে। চালক বলেন, “আমি আর অপেক্ষা করিনি। দ্রুত ট্রেন চালিয়ে এলাকা ত্যাগ করি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।”
সাতকানিয়া উপজেলার যাত্রী আবির হাসান বলেন, “হাতি দেখে ট্রেন থেমে যায়। কিছু যাত্রী জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে একটা বড় হাতি রেললাইনের পাশ থেকে এসে ধাক্কা দিচ্ছে। কেউ কেউ চিৎকার করে উঠে, ভিডিও তোলে। আমরা খুব ভয় পেয়ে যাই।”
চট্টগ্রাম রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানায়, চালকের বিচক্ষণতায় প্রাণহানির কোনো ঘটনা ঘটেনি। রেলওয়ের উচ্চ পর্যায়ের কর্তৃপক্ষ চালক আবদুল আউয়াল ও গার্ড সাখাওয়াত হোসেনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের রেঞ্জ কর্মকর্তা গাজী বাহার উদ্দিন জানান, ঘটনাস্থলে রেললাইনের উভয় পাশে ব্যারিয়ার থাকলেও রেঞ্জ অফিস থেকে ৫০০ মিটার উত্তরে কিছু অংশে এখনো ব্যারিয়ার নেই। ধারণা করা হচ্ছে, হাতিটি ওই খোলা অংশ দিয়েই রেললাইনে উঠে আসে। পরবর্তীতে ট্রেন চলে যাওয়ার পর হাতিটি পাশের একটি আন্ডারপাসের লোহার বেষ্টনী ভেঙে অভয়ারণ্যের ভেতরে ফিরে যায়।
উল্লেখযোগ্য যে, এই অভয়ারণ্য এলাকায় প্রায়ই হাতির চলাচল হয়। ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবর ঈদ স্পেশাল-১০ ট্রেনের ধাক্কায় একটি হাতি গুরুতর আহত হয় এবং দুই দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। পরিবেশবাদীরা দীর্ঘদিন ধরেই এই রেলপথে নিরাপদ হাতি পারাপারের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছেন।
বাংলাদেশ বন বিভাগ ও রেলওয়ের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় এখনো পর্যন্ত পুরো রুটজুড়ে প্রয়োজনীয় আন্ডারপাস বা ওভারপাস তৈরি হয়নি। এ নিয়ে বনবিভাগের একাধিক প্রকল্প চলমান থাকলেও বাস্তবায়ন ধীরগতিতে চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেললাইন নির্মাণের সময় বন্যপ্রাণীর চলাচলের বিষয়টি মাথায় না রাখার ফলেই এ ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। অভয়ারণ্যের ভেতর দিয়ে ট্রেন চলাচলকে কেন্দ্র করে হাতি হত্যার আশঙ্কা বাড়ছে, যা প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, হাতি বাংলাদেশে সংরক্ষিত প্রজাতি। বনবিভাগ এ বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করছে এবং রেলওয়ের সঙ্গে সমন্বয়ে স্থায়ী নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে।