মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে যখন গ্যালারিভর্তি দর্শক হোয়াইটওয়াশের স্বপ্নে চোখ রাঙাচ্ছিলেন, তখন বাংলাদেশ দল যেন সেই স্বপ্নেই হোঁচট খেলো। পাকিস্তানের বিপক্ষে দারুণ শুরু, সিরিজ জয় নিশ্চিত করার পর সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টি-টোয়েন্টিতে সেই স্বপ্ন গুঁড়িয়ে গেল করুণ ব্যাটিং ব্যর্থতায়। ১৭৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ১০৪ রানেই গুটিয়ে যায় টাইগাররা। ৭৪ রানের বিশাল এই হার পাকিস্তানকে দিল অন্তত সান্ত্বনার হাসি, আর বাংলাদেশ পেল স্বপ্নভঙ্গের হাহাকার।
প্রথম দুই ম্যাচে বাংলাদেশ দলের দৃঢ়তা দেখে অনেকে ভেবেছিলেন, পাকিস্তানের বিপক্ষে দীর্ঘদিন পর একটি ওয়াশ-আউট দেখবে ক্রিকেটপ্রেমীরা। সিরিজ আগেই নিশ্চিত হলেও শেষ ম্যাচটি ছিল গর্বের, আত্মবিশ্বাসের এবং ভবিষ্যতের জন্য বার্তা দেয়ার। তবে পাঁচটি পরিবর্তন এনে একাদশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরুতেই বড় চাপে ফেলে টাইগারদের। কিউরেটর গামিনি সিলভা শেষ ম্যাচে দিলেন ব্যাটিং সহায়ক পিচ, যেখানে পাকিস্তানের ব্যাটাররা ঝড় তুলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় শুরুতেই।
লিটনের টস জিতে ফিল্ডিং নেওয়ার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পাকিস্তানের দুই ওপেনার সাইম আইয়ুব ও সাহিবজাদা ফারহান মাত্র ৪৭ বলে গড়েন ৮৭ রানের জুটি। তাসকিন ও শরিফুলকে শুরুতেই কোণঠাসা করে দেন তারা। আইয়ুবের ইনিংস থেমে গেলেও ফারহান ফিফটি তুলে নিয়ে শেষ পর্যন্ত ৬৩ রান করেন। মিডল অর্ডারে হাসান নওয়াজ ও মোহাম্মদ নওয়াজের ছোট কিন্তু কার্যকর ইনিংসে পাকিস্তান পৌঁছে যায় ১৭৮ রানে।
বাংলাদেশের পক্ষে কিছুটা আলো দেখান নাসুম আহমেদ ও তাসকিন আহমেদ। নাসুম ৪ ওভারে ২২ রানে ২ উইকেট এবং তাসকিন ৩৮ রানে ৩ উইকেট নেন। তবে শুরুতেই পাওয়ার প্লেতে যে ভয়াবহ খরুচে বোলিং, সেটিই পাকিস্তানের বড় স্কোরের ভিত্তি গড়ে দেয়। মেহেদী হাসান, শরিফুল, সাইফউদ্দিন— সবাই ছিলেন অপ্রতিরোধ্য ব্যাটিংয়ের সামনে অসহায়।
তবে বাংলাদেশের আসল বিপর্যয় আসে ব্যাট হাতে। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই তামিম সাজঘরে ফেরেন, এরপর ফাহিম আশরাফের বলে লিটন, মিরাজ— কেউই থিতু হতে পারেননি। পাওয়ার প্লে’র মধ্যেই স্কোরবোর্ডে ২৯ রান তুলতে হারায় ৫ উইকেট। এমনকি টি-টোয়েন্টি ইতিহাসে নিজেদের সর্বনিম্ন স্কোর ৭০ রানের নিচে নামার শঙ্কাও ঘুরপাক খায়।
তবে সেই লজ্জা কিছুটা ঠেকান মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। ইনিংসের শেষদিকে একমাত্র তিনিই ছিলেন বলার মতো ব্যাটার। ৩৪ বলে ৩৫ রানের অপরাজিত ইনিংসে বাঁচান বাংলাদেশকে আরও বড় লজ্জা থেকে। শরিফুলের একটি ছক্কা বাদ দিলে বাকি ব্যাটারদের কেউই দুই অঙ্কে পৌঁছাতে পারেননি।
পুরো ইনিংসে ১০০ বলের মধ্যে ৫০ ডট, মাত্র ৮টি বাউন্ডারি এবং ৩টি ছক্কা— এর মধ্যে ২টি এসেছে সাইফউদ্দিনের ব্যাট থেকে। আর পুরো দলের রান গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র ১০৪-এ। পাকিস্তানের হয়ে সালমান মির্জা নেন ৩ উইকেট, ফাহিম আশরাফ ও মোহাম্মদ নওয়াজ পান দুটি করে উইকেট। আর এই ব্যর্থতায় তৃতীয় টি-টোয়েন্টি ছিল যেন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় আক্ষেপের রাত।
মিরপুরের এই পরাজয় শুধু একটি ম্যাচ হার নয়, বরং আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরানোর মতো। যেভাবে সিরিজ শুরু করেছিল বাংলাদেশ, সেভাবেই শেষ করতে পারলে বার্তা পৌঁছত ক্রিকেটবিশ্বে। কিন্তু শেষ ম্যাচের এই হতাশাজনক পারফরম্যান্স সেই বার্তাকে ঢেকে দিল চুপচাপ একটা হারের ছায়ায়।
দর্শকদের জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছিল— যে ভেন্যুতে ১০ বছর আগে পাকিস্তানকে ওয়ানডেতে হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ, সেখানে এবার স্বপ্নই ভাঙল বড় ব্যবধানে হার দিয়ে।