বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে জাতীয় নারী ফুটবল দলের একজন খেলোয়াড় পারভীন আক্তার পারুলের পায়ের রগ কেটে দেওয়ার অভিযোগ। প্রচলিত গল্পে বলা হচ্ছে, নারীদের ফুটবল খেলাকে ইসলাম ‘হারাম’ ঘোষণা করায় স্থানীয় কিছু ‘উগ্রবাদী মৌলবাদী’ তার ওপর এই বর্বর হামলা চালায়। কিন্তু যখন ঘটনাটিকে ঘিরে বিস্তর অনুসন্ধান চালানো হয়, তখন এই চাঞ্চল্যকর দাবিটির ভিত্তির চেয়ে তার পেছনের উদ্দেশ্যই বেশি আলোচিত হয়ে ওঠে।
ঘটনার মূল সূত্রপাত চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল, কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কালারমাছড়া এলাকায়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ প্রভাবশালী নেতা এবং সাবেক চেয়ারম্যান তারেক বিন ওসমান শরীফের ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠা ছাত্রলীগ ক্যাডার অমিত হাসান এবং তার ভাই কামরুল হাসানের নেতৃত্বে একটি সন্ত্রাসী দল মোহাম্মদ রশীদ নামক এক ব্যক্তিকে নির্মমভাবে হত্যা করে বলে অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলায় পারভীন আক্তার পারুল—অমিত ও কামরুলের আপন ছোটবোন—এই হত্যাকাণ্ডের ৫ নম্বর আসামি হিসেবে চিহ্নিত হন।
এরপর জুন মাসে একটি অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পারুল দাবি করেন, তার ভাইদের কুপিয়ে আহত করা হয়েছে এবং তার নিজের পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়েছে। এই বিবরণকেই আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ একটি অনলাইন পত্রিকা ব্যবহার করে এমন প্রচারণা শুরু করে যে, ইসলামপন্থী মৌলবাদীরা নারীদের ফুটবল ‘হারাম’ বলে গণ্য করায় পারুলের রগ কেটে দিয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং ইসলাম-বিদ্বেষী গোষ্ঠী ও সরকারি দলের কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রচারণার অস্ত্র হয়ে ওঠে।
তবে পুরো ঘটনার ভিন্ন এক দিক উন্মোচিত হয় বিএনপির একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী মীর জাহানের ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। তিনি লিখেছেন, “মূল ঘটনা হলো—খুনের দায়ে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা অমিত ইকবাল ও কামরুল এই পারভীনের ভাই। কামরুলকে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের বাড়ি ঘেরাও করে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। সেই সময় টিন বা অন্য কিছুর সাথে লেগে পারভীনের পা কেটে যায়। কিন্তু ফুটবল খেলা ইসলামে হারাম বলে উগ্রবাদীরা পায়ের রগ কেটে দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
এমন মন্তব্য কেবল পারুলের রগ কাটার ঘটনার সত্যতা নিয়ে সন্দেহই জাগায় না, বরং এটিও প্রতীয়মান করে যে, ঘটনাটি হতে পারে রাজনৈতিক নাটকীয়তারই অংশ, যার মাধ্যমে একদিকে রশীদ হত্যাকাণ্ডের মূল আসামীদের দায় থেকে রেহাই দেওয়া, অন্যদিকে মৌলবাদ-ভীতি ছড়িয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে আরও শক্তিশালী করা।
এখানে প্রশ্ন ওঠে—যখন মূল ঘটনা একটি খুন, যার পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক সহিংসতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি দলের সন্ত্রাসী বাহিনী জড়িত, তখন সেই বাস্তবতাকে আড়াল করে ‘ধর্মীয় মৌলবাদ’কে সামনে আনা কেন? পারুল যদি সত্যিই রগ কাটা হামলার শিকার হতেন, তাহলে তার চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো স্বতন্ত্র প্রমাণ, হাসপাতালের ডকুমেন্টেশন কিংবা পুলিশের মামলা—কিছুই কেন প্রকাশ্যে এল না?
এছাড়া, ঘটনার পরপরই ভিডিও ফুটেজে এবং ফেসবুকের কমেন্ট সেকশনে দেখা যায় স্থানীয় এক বাসিন্দা, পারভেজ, সরাসরি প্রশ্ন করছেন—“আমার নামে যে অভিযোগ আনলেন, সেটা কি যাচাই করে এনেছেন?” এসব মন্তব্য এবং স্থানীয়দের বিবরণ, বিশেষ করে পারভীন আক্তারের সাথে যোগাযোগে সাংবাদিকদের ব্যর্থতা, পুরো ঘটনাকে ঘিরে রহস্যের জট আরও গভীর করে।
অনেকেই আশঙ্কা করছেন, রাষ্ট্রীয় ও দলীয় প্রচারমাধ্যমগুলো এই ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সমাজে ধর্মীয় বিভক্তি তৈরি করতে চায়, এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিজেদের ‘ধর্মনিরপেক্ষতার ধারক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী। অথচ এই পুরো প্রচারণার পেছনে রয়ে গেছে একটি পরিবার, যারা একজন প্রিয়জন হারানোর শোক এবং ন্যায়বিচারের আশায় প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
পারভীন আক্তার পারুল বর্তমানে জামিনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—তার ভাই অমিত ও কামরুল হাসানের মতো খুনের আসামীদের রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং সরকারি দলের প্রভাব কি আইনের চেয়ে বড় হয়ে গেছে? পারুলের আঘাত সত্যিকারের হলে দোষীদের শাস্তি হোক—এতে কারও আপত্তি নেই। কিন্তু সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিথ্যা গল্প গড়ে একটি খুনের বিচারকে যদি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা কেবল আইনের অবমাননাই নয়, গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাতও বটে।
এই প্রেক্ষাপটে দরকার একটি নিরপেক্ষ, স্বাধীন এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত—যাতে সত্য উদ্ঘাটিত হয়, নিরীহ কেউ হয়রানির শিকার না হন এবং অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়। নয়তো ‘ফুটবল হারাম’ তত্ত্বকে ঘিরে বাস্তবতাকে অস্বীকার করে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘মৌলবাদী রাষ্ট্র’ প্রমাণ করার যেসব প্রচেষ্টা চলছে, তা অব্যাহত থাকবে এবং ভবিষ্যতের প্রতিটি ঘটনা নতুন গুজবের জন্ম দেবে।
নেটিজেনরা মনে করছেন, বাংলাদেশে সত্যের পক্ষে কথা বলার সাহস এখন একান্ত প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রচার নয়, মানবিকতা, আইন এবং সত্যের জয় হোক।