বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে পুরনো ঘৃণার রাজনীতি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে—এই দাবি করেছেন জনপ্রিয় ইসলামিক লেখক ও বক্তা আসিফ আদনান। বৃহস্পতিবার ১৭, জুলাই ২০২৫ জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তাকে এবং আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ইসলামপন্থী নেতাকে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা জঙ্গি মামলায় জড়ানো হয়েছে। তিনি এই মামলাকে শুধু মিথ্যা বা মানহানিকরই নয়, বরং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ নাগরিকদের স্বাধীনতার জন্য এক গভীর হুমকি বলেও আখ্যা দেন।
আসিফ আদনান বলেন, তাদের কেবল ইসলামি চিন্তা ও আদর্শের জন্যই টার্গেট করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি ও প্রতিবেশী শক্তির বিভিন্ন এজেন্ডার বিরুদ্ধে তারা বরাবরই উচ্চকণ্ঠ, যা হয়তো কিছু গোষ্ঠীর বিরাগভাজন হওয়ার কারণ হতে পারে। তার দাবি, জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় খোলার বিরোধিতায় ইসলামপন্থীরাই সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে ছিলেন, এবং এই মামলাটি তাদের জন্য একটি হুঁশিয়ারি বার্তা হতে পারে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশে “মিলিটেন্সি” নামের ট্যাগটি যেন হত্যা, গুম ও নির্যাতনের বৈধতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। যখন কাউকে “জঙ্গি” বলা হয়, তখন তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা বৈধ বলে ধরে নেওয়া হয়। অতীতে এমন বহু ঘটনার নজির রয়েছে যেখানে মানুষকে গুম, ক্রসফায়ার কিংবা মিথ্যা স্বীকারোক্তিতে বাধ্য করা হয়েছে।
আসিফ আদনান জোর দিয়ে বলেন, এই অভিযোগে তারা আইনি পরামর্শ নিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন ইনশাআল্লাহ। তবে, এটি কেবল তাদের কয়েকজনের বিষয় নয়। যদি তাদের মতো পরিচিত মুখরা এমন ভুয়া মামলার শিকার হন, তাহলে সাধারণ মাদরাসা শিক্ষক, গরিব কর্মচারী, বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কে রক্ষা করবে?
তিনি বলেন, “জঙ্গি” ট্যাগ একবার যে চর্চা শুরু হয়, তা পরে শুধু ইসলামপন্থীদের নয়—সমস্ত ভিন্নমত দমনেই ব্যবহার হয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ৫,আগস্ট লংমার্চের দিনও রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় ছাত্র-জনতার গণজাগরণকে ‘মিলিট্যান্ট অ্যাটাক’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল, সবাইকে ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে ঘর থেকে না বের হওয়ার বার্তা দেয়া হয়।
আসিফ আদনান বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে র্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে “ফার্স্ট ফ্লাইট অপারেশন”, মিথ্যা মিলিট্যান্সি নাটক, জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় এবং নিরপরাধ নাগরিকদের বিরুদ্ধে সাজানো মামলা এক ভয়ানক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। একটি ফেসবুক পোস্ট বা কারো সঙ্গে তোলা ছবিকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে কিশোর-কিশোরীদের ‘আমির’ বানানো হয়েছে। এমনকি পর্দানশীন নারীদের উপর মধ্যযুগীয় যৌন নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে, যেগুলোর প্রমাণ পাওয়া গেছে “গুম কমিশন রিপোর্ট” ও “আয়নাঘর ইনভেস্টিগেশন” সহ বহু নিরপেক্ষ তদন্তে।
তিনি আরো বলেন, দাড়ি রাখা, টুপি পরা, পায়ের উপরে কাপড় পরা, ইসলামি বই পড়া, ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলা—এসবকে উগ্রবাদের লক্ষণ বলে প্রচার করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি দাওয়াত ও সমাজে ইসলামের উপস্থিতিকে কমিয়ে আনা।
আসিফ আদনান ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও শেয়ার করেন—কীভাবে র্যাব কর্মকর্তা আলেপ উদ্দিন তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়, এবং কীভাবে সরকারের ট্রান্সজেন্ডার আইন নিয়ে লেখার পর তার বক্তব্য ‘মিলিট্যান্ট’ বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়।
তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যখন ইসলামী বক্তারা, লেখকরা বা সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষদের বিরুদ্ধে শুধু একটি ছবির ভিত্তিতে মামলা হয়, তখন চরম অপরাধে লিপ্ত ছাত্রলীগের মতো সংগঠনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না সরকার। তিনি বলেন, “গ্রামের মানুষ কবে থেকে পিস্তল আর রাইফেল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়?” অথচ এই সহিংসতার জন্যও আওয়ামী লীগকে কেউ ‘জঙ্গি’ বলে না।
তিনি দাবি করেন, এই “মিলিট্যান্সি নাটক” রচনার মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলাম প্রচার ও ইসলামী চিন্তাবিদদের চুপ করিয়ে দেয়া, বিদেশিদের খুশি করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কৃত্রিম সাফল্যের ভিত্তিতে পদোন্নতির ব্যবস্থা করা। তার দৃঢ় বার্তা—এই পরিকল্পিত জাহিলিয়াত আবার ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টা ব্যর্থ হবে ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, “যারা ষড়যন্ত্র করছে, তারা জানুক—তারা সফল হবে না। ইতিহাস অত্যাচারীদের পক্ষে নয়। আর আল্লাহ সবকিছুর সাক্ষী।”
তিনি সবাইকে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। ইসলামপন্থীদের কণ্ঠরোধের মাধ্যমে রাষ্ট্র যে ভয়ংকর দমননীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, তা রোধ করতে হলে এখনই সত্য বলা, বিচার দাবি করা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।