ঝিনাইদহ জেলা শহরে সুদীপ জোয়ার্দার নামে এক তরুণ আত্নহত্যা করেছে বলে গতকাল ৬ জুলাই তার পরিবার দাবি করেন। শহরের স্বর্ণকারপট্টি এলাকায় নিজ বাস ভবনে সুদীপ গলায় দড়ি দিয়ে আত্নহত্যা করেছে বলে তার পরিবার প্রচার করতে থাকে। সুদীপের বন্ধুরা ও অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে সুদীপের মরদেহ দেখে অনুমান করেন, এটা আত্নহত্যা নয়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের দাগ ও পায়ে শক্তভাবে রশি বাঁধার দাগ তারা দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। আজ ৭ জুলাই সকালে জেলা শহরের পোস্ট অফিস মোড়ে সুদীপের মরদেহ নিয়ে বন্ধুরা এই পরিকল্পিত হত্যাকান্ড বিচারের জন্য দাবি জানান।
সুদীপ তার পারিবারিক জীবনে নানান কষ্টের সম্মুখীন হন বলে তার একাধিক বন্ধু নিশ্চিত করেন। সুদীপের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু ঝিনাইদহ টেক্সটাইল কলেজের প্রভাষক ফাহাদ মাহমুদ মারুত তার এক ফেসবুক পোস্টে সুদীপের অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার এই পোস্টে সুদীপের কঠিন পারিবারিক জীবন, সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে টানাপোড়েন এবং পরিবারের অবহেলা ও মানসিক নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে, যা শেষ পর্যন্ত তার অকাল মৃত্যুর কারণ হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফাহাদ মাহমুদ মারুত এবং সুদীপের অন্যান্য বন্ধু এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা মানতে নারাজ এবং এর পেছনে পারিবারিক যোগসাজশের অভিযোগের তীর ছুঁড়েছেন।
ফাহাদ মাহমুদ তার পোস্টে উল্লেখ করেছেন যে, সুদীপ কিছুটা চাপা স্বভাবের হওয়ায় পরিবার সম্পর্কে কখনো মুখ খুলতো না। অনেক বছর পর এক আড্ডায় সুদীপ তার পারিবারিক জীবনের কিছু কঠিন দিক তুলে ধরেছিলেন। সুদীপের মায়ের মৃত্যুর পর তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং তার সৎ মায়ের আগের পক্ষের একটি ছেলে সন্তানও ছিল। সুদীপের সৎ মা ও সৎ ভাই সুদীপকে শত্রু জ্ঞান করতে শুরু করে, কারণ সুদীপই ছিল সেই বনেদি ব্যবসায়ী পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারী। বিপুল সম্পত্তির হাতছানি সুদীপের সৎ মা’কে তার প্রতি কখনোই আপন সন্তানের মতো আচরণ করতে দেয়নি। ছোটবেলা থেকেই সুদীপের ভাগ্যে জুটতো অবশিষ্ট খাবার ও পোশাক।
সুদীপকে উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর ঢাকায় গিয়ে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার পরামর্শ দিলে সে জানায়, এমন পরিস্থিতিতে তার সৎ মা এবং বাবা তাকে দুটি শর্ত দিতেন। এক, ঝিনাইদহ ছাড়লে তাকে চিরতরে ছাড়তে হবে এবং সম্পত্তিতে কোন অধিকার থাকবে না মর্মে লিখিত দিতে হবে। এই শর্তের কারণেই উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সে ঝিনাইদহ ছাড়তে পারেননি। পরিবার যখন তাকে বাড়ি থেকে বের করতে পারছিল না, তখন তার উপর মানসিক নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়তে থাকে। সে তার বাবা-চাচার ব্যবসা দেখভাল করলেও, প্রতিদিন মাত্র ১৩০ টাকা হাতখরচ পেতো, যেখানে কর্মচারীদের ন্যূনতম বেতন ছিল মাসে ১০ হাজার টাকা। সুদীপের কোনো শখ বা ইচ্ছা পূরণ করার নজির ছিল না; জমানো টাকা দিয়ে বহু বছর অপেক্ষা করে সে শখ পূরণ করতো।
সবশেষ, সুদীপ মেরুদণ্ডের সমস্যায় ভুগছিলেন। ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ার ডাক্তাররা তাকে ভারত বা ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরিবার চিকিৎসার খরচ দিতে টালবাহানা শুরু করে এবং একপর্যায়ে তাকে যশোরের এক কবিরাজের কাছে নিয়ে যায়।
ফাহাদ মাহমুদ পোস্টে উল্লেখ করেন, যে দিন সুদীপ মারা যায়, সেদিন তার সৎ ভাই বন্ধুদের নিয়ে আনুমানিক রাত ৯-৯.৩০টার দিকে বাসায় প্রবেশ করে এবং একই সময়ে আরও কিছু বহিরাগতকে সেই বাসায় প্রবেশ ও প্রস্থান করতে দেখা যায়। সুদীপকে তৃতীয় তলায় সবচেয়ে কম সুযোগ সুবিধাসম্পন্ন রুমে থাকতে দেওয়া হতো এবং সেই ফ্লোরে তার ভাই থাকতো।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, সুদীপ জীবিত থাকাকালীন যেমন তার প্রতি পরিবার অবহেলা ও অযত্ন করে গেছে, তেমনি মারা যাওয়ার পরেও তার লাশ ফ্রিজিং থেকে শুরু করে দাফনকার্য পর্যন্ত পরিবার থেকে কোনো দায়িত্ব পালন করা হয়নি। বরং তার বন্ধুরাই পরিবারের মতো তার জন্য যা যা করণীয়, তা করেছেন। তার আপন পিতা সুদীপের মৃত্যুর পর থেকে লাশ পোস্টমর্টেম পর্যন্ত ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না।
ফাহাদ মাহমুদ মারুত তার পোস্টে সুদীপের মৃত্যুকে ‘অস্বাভাবিক’ আখ্যা দিয়ে দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেছেন, “মুখোশধারী সুন্দর চেহারার এই অমানুষদের সাথে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে গিয়েই বরং সুদীপ ভাল করেছে। অমানুষদের এই দুনিয়ায় হয়ত পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ম্যানিপুলেট হবে, টাকার বিনিময়ে হয়ত অনেকেই বিক্রি হবে তবে আমাদের কাছে এটা পরিবার কতৃক একজন অসম্ভব সম্ভাবনাময় ভাল মানুষের হত্যা বৈ আর কিছুই না।” এই বক্তব্য স্পষ্টতই ইঙ্গিত করে যে, লেখক এবং তার বন্ধুরা সুদীপের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মানতে নারাজ এবং এর পেছনে তার পরিবারের হাত রয়েছে বলে তারা মনে করেন। এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের দিকেই ইঙ্গিত করছে, যদিও বিস্তারিত কোনো তদন্ত রিপোর্ট পোস্টে উল্লেখ করা হয়নি। সুদীপের মৃত্যুর ঘটনাটি তার পরিচিত মহলে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।