উত্তরা দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর প্রকৃত নিহতের সংখ্যা নিয়ে শুরু হয়েছে বিভ্রান্তি। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা ৩১ হলেও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যেতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে শুরু হয় নানা ধরনের তথ্যের ঢল, আর ঠিক সেই মুহূর্তে স্কুলটির শিক্ষিকা পূর্ণিমা দাস তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেইজে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে লিখেছেন, “ভুল তথ্য ছড়াবেন না, মানুষের ইমোশন নিয়ে খেলবেন না।”
২৩ জুলাই ফেসবুকে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে তিনি জানান, স্কুল ছুটি হয় দুপুর ১টায় এবং তিনি নিজেই ১টা ১ বা ২ মিনিটে স্কাই সেকশনে ঢুকে দেখেন, সব ছাত্র-ছাত্রী ইতোমধ্যেই বের হয়ে গেছে। তবে কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক এসে না পৌঁছানোর কারণে তারা আবার ভেতরে ঢোকে এবং পরবর্তীতে দুর্ঘটনার শিকার হয়। তিনি লেখেন, “৫-৬ জন ঢুকেছিলো, তারাই হারিয়ে গেছে। যারা করিডোরে, দোলনায় খেলছিলো বা সিঁড়িঘরে ছোটাছুটি করছিলো তারাও হয়তো ঝুঁকিতে ছিলো।”
তিনি জানান, ক্লাউড ক্লাসরুমে স্কাই ক্লাসের চেয়ে বেশি (৮-১০ জন) শিক্ষার্থী ছিল, সেখান থেকেই মাহরীন মিস, মাসুকা মিস ও মাহফুজা মিস চেষ্টা করেন বাচ্চাদের বের করে আনার। কিন্তু মাহরীন ও মাসুকা মিস প্রাণ হারান, আর মাহফুজা মিস বর্তমানে লাইফ সাপোর্টে। পাশের রুমগুলোতে যেমন ‘ময়না’ ক্লাসে কেউ মারা যায়নি, ‘দোয়েল’ ক্লাসে একজন শিশু মারা গেছে। তবে কিছু রুমে সবাই নিরাপদে ছিল।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “হায়দার আলী ভবনের দোলনায়, করিডোরে, সিঁড়িতে যে বাচ্চারা হাঁটছিলো তাদের সংখ্যা বলা কঠিন। অনেকের শরীর ছাই হয়ে গেছে, লাশ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আয়া-স্টাফরাও এর শিকার হয়েছেন।”
যারা অভিযোগ করছেন যে লাশ গুম করা হচ্ছে, তাদের উদ্দেশে পূর্ণিমা বলেন, “আমরা শিক্ষক, রাজনীতিবিদ নই। একটা বাচ্চাকে বাঁচাতে না পারলেও তার লাশটা তার পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
একদিন আগের আরেকটি ফেসবুক পোস্টে পূর্ণিমা দাস লিখেছিলেন, দুপুর ১টা ১০-১৫ মিনিটের দিকে একটি ফাইটার জেট স্কুল ভবনে বিধ্বস্ত হয় এবং মুহূর্তেই আগুন লেগে যায়। যেসব ক্লাসে তখনও বাচ্চারা অবস্থান করছিলো, সেগুলোর মধ্যে ক্লাস থ্রি থেকে ফাইভ এবং ইংরেজি ভার্সনের সিক্স থেকে এইট উল্লেখযোগ্য। আগুন লাগার ঠিক আগে তিনি ওই করিডোর পার হয়ে টিচার্স রুমে পৌঁছান এবং দেখেন ভয়ঙ্কর শব্দের পর ছোট ছোট বাচ্চারা আগুনের গ্রাসে পুড়ে যাচ্ছে। নিজে কোনোভাবে ওয়াশরুমে গিয়ে কিছু শিক্ষার্থীর গায়ে পানি ঢালার চেষ্টা করছিলেন, এমন সময় সহকর্মীদের চিৎকারে বের হয়ে দেখেন করিডোরজুড়ে আগুন এবং একজন সহকর্মী দগ্ধ হয়ে তাঁর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে বাঁচার আকুতি করছেন।
তিনি সেই মুহূর্তের ভয়াবহতার বর্ণনায় বলেন, “আমি তখনও স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে, কেউ একজন টেনে নিয়ে যায়। গ্রিল ভেঙে আমাদের বের করা হয়। পাঁচ মিনিট আগেও আমি যে বাচ্চাগুলোকে ভালো দেখেছি, পাঁচ মিনিট পর তাদের পোড়া শরীর দেখেছি।”
তিনি লেখেন, “ভগবান কেন এমন দিন দেখালেন জানিনা। কেন আমার কিছু হয়নি জানি না। জানি না কাদের আর কোনোদিন দেখতে পাবো না। কত মায়ের বুক আজ খালি হলো – জানিনা।”