জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস মার্চ মাসে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও রোহিঙ্গা সংকটের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বরং উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। মিয়ানমারের জান্তা সরকার এই সময়ে আরও বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশের সরকার আন্তর্জাতিক মহলে বারবার তুলে ধরলেও মিয়ানমারের ওপর কোনো কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, মার্চে গুতেরেসের সফরের সময় জাতিসংঘ, ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদী আলোচনা হয়। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাসও দেওয়া হয়। কিন্তু এর বাস্তব রূপ এখনো অধরা। মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে গেলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মিয়ানমার এ বিষয়ে কোনো সদিচ্ছা দেখাচ্ছে না। এমনকি বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাও এখন প্রত্যাবাসন অগ্রগতির বিষয়ে রিপোর্ট চেয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি বিশদ প্রতিবেদন তৈরির কাজ শুরু করেছে।
এই অবস্থায়, আগামী ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, জাতিসংঘ প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনসমূহ অংশ নেবে। সম্মেলনটি উদ্বোধন করবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আর ৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হবে রোহিঙ্গা, আন্তর্জাতিক শরণার্থী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বিষয়ক একটি বিশেষ অধিবেশন, যেখানে বাংলাদেশ জোরালোভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি তুলে ধরবে।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ব্যয় দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু সংকটের কোনো সমাধান মিলছে না। তাই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ইউএনএইচসিআর ও বিশ্বব্যাংকের কাছে আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়েছে। অথচ, বিশ্বব্যাংক সহায়তা দেওয়ার আগে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অগ্রগতির ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো চাপ প্রয়োজন। কিন্তু আমরা সেই কাক্সিক্ষত সহায়তা পাচ্ছি না।” তিনি আরও জানান, জাতিসংঘ হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি ঢাকায় এসে এই বিষয়ে আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র জানায়, গুতেরেসের সফরের সময় রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক করিডর তৈরির প্রস্তাব নিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়ার কারণে নেতিবাচক বার্তা গিয়েছিল মিয়ানমারের কাছে। এমনকি ইউএনএইচসিআরও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে, যার প্রভাব পড়েছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কূটনৈতিক গতিপথে।
বর্তমানে জাতিসংঘ ও ইউএনএইচসিআর ‘তৃতীয় কোনো নিরাপদ অঞ্চল’ বা তৃতীয় দেশে স্থানান্তরের একটি বিকল্প প্রস্তাব বিবেচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রও এই ধারণার প্রতি সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো প্রত্যাবাসনের স্থায়ী সমাধান চায়। অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মন্তব্য করেন, “জাতিসংঘ এখানে প্রধান ভূমিকা রাখার কথা, কিন্তু তারা এখন কার্যত অকার্যকর ভূমিকা পালন করছে। তাই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।”