৯/১১ দুর্ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতিকে কেন দায়ী করেছেন জোহরান মামদানির বাবা? - দৈনিক সাবাস বাংলাদেশ
নোটিশ:
শিরোনামঃ
মনোনয়ন বিতরণের শেষদিনে রাকসু কার্যালয়ে ভাঙচুর করল রাবি ছাত্রদল পাগলা মসজিদের দানবাক্সে রেকর্ড ১২ কোটি ৯ লাখ টাকা তাসকিন–লিটনের ঝড়ে ডাচদের সহজে হারাল বাংলাদেশ, সিরিজে ১–০ নেতৃত্ব সাবেক ভিপি নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে কুড়িগ্রামে বিক্ষোভ কেরালায় ক্যানারা ব্যাংকে গরুর মাংস নিষিদ্ধ, কর্মীদের ‘বিফ-ফেস্ট’ প্রতিবাদ ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম: জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধসহ তিন দফা দাবিতে গণঅধিকার পরিষদের হুঁশিয়ারি ভিপি নূরের ওপর হামলা সেনা নেতৃত্বে: পিনাকী যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা: ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের জাতিসংঘে যোগ দেওয়ার পথ বন্ধ নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর সন্ধানের দাবিতে ইবিতে ছাত্রশিবিরের মানববন্ধন কিশোরগঞ্জ পাগলা মসজিদের দানবাক্সতে ৩২ বস্তা টাকা ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা সহ নানান চিরকুট

৯/১১ দুর্ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতিকে কেন দায়ী করেছেন জোহরান মামদানির বাবা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই, ২০২৫
  • ৬৯ বার দেখা হয়েছে
ছেলে জোহরান ও স্ত্রীর সাথে মাহমুদ মামদানি, ছবি: ডেইলি মেইল
ছেলে জোহরান ও স্ত্রীর সাথে মাহমুদ মামদানি, ছবি: ডেইলি মেইল

জোহরান মামদানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে পদপ্রার্থী হবার পর দীর্ঘদিন পর নতুন করে আলোচনায় আসে একটি বই। বইটির লেখক আর কেউ নয়, খোদ জোহরানের বাবা! ২০০৪ সালে ইসলাম বিদ্বেষ যখন চরম আকার ধারণ করেছিলো, বিশ্ব রাজনীতির চিত্রপটে ইসলাম ও মুসলিম পরিচয়ের ভূমিকা এবং পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মাহমুদ মামদানির রচিত বই Good Muslim, Bad Muslim: America, the Cold War, and the Roots of Terror। এই বইয়ে লেখক যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির পর্যালোচনা করেছেন, যেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে দ্বিধাবিভক্ত দৃষ্টিতে দেখা হয়। একইসঙ্গে, ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পিছনের ভূরাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করেছেন, যা শুধুমাত্র ধর্মীয় উগ্রবাদ বা মৌলবাদী মতাদর্শ থেকে উৎসারিত নয়, বরং পশ্চিমাদের ‘নির্মিত’ ইতিহাসের ফলাফল বলেই দাবি করেছেন তিনি।

মামদানি তার বইয়ে ১৯৮০’র দশকের আফগান যুদ্ধের দিকে নজর দিয়েছেন, যেখানে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘মুজাহিদীন’ নামক যোদ্ধাদের শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সিআইএ’র মাধ্যমে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করে। এই পুরো ঘটনাকে তিনি ‘স্নায়ুযুদ্ধের প্রক্সি-ওয়ার’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, মুজাহিদীন বা জিহাদি যোদ্ধাদের কেবল সামরিকভাবে নয়, আদর্শিকভাবেও প্রশিক্ষিত করা হয়েছিল। মার্কিন মদদপুষ্ট এই ‘জিহাদ’ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটানোর কৌশলগত এক অংশ।

তার ভাষায়, তালেবান বা আল-কায়েদা নামক গোষ্ঠীগুলোর জন্মভূমি হয়ে ওঠে ওই সময়কার আফগানিস্তান। মামদানি স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন, তালেবানের উত্থান কোনো স্থানীয় ধর্মীয় বিপ্লবের ফলাফল নয়, বরং মার্কিন ভূরাজনীতির প্রত্যক্ষ অবদানেই এই গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ঘটে।

মামদানি তার বিশ্লেষণে ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার জন্য সরাসরি স্নায়ুযুদ্ধকালীন মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিকে দায়ী করেছেন। তার মতে, আফগানিস্তানে আমেরিকার গড়ে তোলা অস্ত্রোপচারে পরিণত ‘জিহাদীদের ল্যাবরেটরি’ থেকে ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটে। যারা একসময় আমেরিকার “বন্ধু যোদ্ধা” ছিল, তারাই পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের “শত্রু সন্ত্রাসী” হয়ে ওঠে। এই পরিণতি ছিল সম্পূর্ণ মার্কিন নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদি ভুল সিদ্ধান্তের ফলাফল।

বইটির শিরোনামই নির্দেশ করে – যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম বিশ্বকে দুটি ভাগে ভাগ করেছে: “ভালো মুসলমান” ও “খারাপ মুসলমান”। মামদানি ব্যাখ্যা করেছেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থে সমর্থন দেয়, মার্কিন নীতিনির্ধারকরা তাদের ‘ভালো মুসলমান’ বলে চিহ্নিত করে। অপরদিকে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান নেয়, তাদের আখ্যা দেওয়া হয় ‘খারাপ মুসলমান’ বা ‘সন্ত্রাসী’ বলে।

যেমন, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যারা আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র, তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন সত্ত্বেও তারা ভালো মুসলমান হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে, কোনো মুসলিম গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরোধিতা করলেই তা পরিণত হয় সন্ত্রাসবাদী শক্তিতে।

মামদানি বইটিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের ইসলামোফোবিয়ার অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধান করেছেন। তার মতে, ইসলামোফোবিয়া মূলত একটি রাজনৈতিক নির্মাণ, যা পশ্চিমা ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে রক্ষার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। ইসলামের আদর্শ বা মূল্যবোধ নয়, বরং রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েমের লক্ষ্যে ইসলাম ও মুসলিম পরিচয়কে ভীতিকর রূপে উপস্থাপন করা হয়।

ইসলামকে একটি সামগ্রিক ‘সংকট’ হিসেবে চিত্রিত করে পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদের দখলদারিত্ব, সামরিক হস্তক্ষেপ, এবং অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের যৌক্তিকতা তৈরি করেছে। মামদানি বলেন, ইসলামোফোবিয়া কোনো স্বতঃসিদ্ধ মানসিকতা নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা একটি রাষ্ট্রীয় প্রচারণা ও মিডিয়া কৌশল।

মামদানি তুলে ধরেছেন, কিভাবে ইতিহাসকে বিকৃত করে উপনিবেশবাদীরা এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে ইসলাম ও মুসলমানদের ‘অন্যান্য’ করে তুলেছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নামে যেসব অভিযান পরিচালিত হয়েছে, সেগুলো মূলত ভূরাজনৈতিক স্বার্থের জন্যই পরিচালিত, যার শিকার হয়েছে মুসলিম বিশ্ব।

এই বইকে মামদানি শুধুমাত্র একাডেমিক গবেষণা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বলেও অভিহিত করেছেন। কারণ তার মতে, ইসলামোফোবিয়া এবং ভূরাজনীতির এই দ্বিমুখী মানদণ্ডের নৈতিক প্রশ্ন তোলা অপরিহার্য।

তিনি শিক্ষার্থীদের এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন সন্ত্রাসবাদ ও রাজনীতির ইতিহাসকে পুনরায় বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করে। মুসলিম বিশ্ব ও রাজনৈতিক ইসলামের বিকল্প বয়ান নির্মাণের ক্ষেত্রে এই বইটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মাহমুদ মামদানির Good Muslim, Bad Muslim একটি গভীর বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ, যা সন্ত্রাসবাদ, ইসলামোফোবিয়া এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির জটিল সম্পর্ককে স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছে। এই বইয়ে লেখক দেখিয়েছেন, ইসলামের নামে পরিচালিত সহিংসতার পেছনে রয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধকালীন নীতির সুদূরপ্রসারী ভুল সিদ্ধান্ত ও আধিপত্যবাদী কৌশল।

মামদানি মনে করেন, ইসলাম ও মুসলিম পরিচয়ের দমন নয় বরং ইতিহাসের সঠিক পাঠ ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। ইসলামোফোবিয়াকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সহিংসতা, বৈষম্য ও বিভাজন আরও বাড়বে।

এই কারণে তার বই বিশ্বব্যাপী একাডেমিক অঙ্গন এবং নীতিনির্ধারকদের মাঝে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক ইসলাম, পররাষ্ট্রনীতি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিষয়ে যারা গবেষণা করেন, তাঁদের জন্য বইটি এক অপরিহার্য পাঠ্য হয়ে উঠেছে।

শেয়ার করুন

Comments are closed.

এই ধরনের আরও নিউজ

© কপিরাইট ২০২৪-২০২৫ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: NagorikIT