
বাংলাদেশে ‘ট্যাগিং রাজনীতি’ এখন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক গভীর অপকৌশলের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা ও ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রযন্ত্র নানা সময় নাগরিকদের ওপর “উগ্রবাদী”, “জঙ্গি”, এমনকি “রাষ্ট্রদ্রোহী” ইত্যাদি ট্যাগ আরোপ করেছে। এসব কেবল ভিন্নমত প্রকাশের জন্য ব্যবহার করা হয়নি, বরং আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের উপায় হিসেবেও এটি ছিল সহজ মাধ্যম।
সাম্প্রতিক বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনার সূত্র ধরে নিছক ধারণার বশে দেশের জনপ্রিয় তরুণ আলেমদের নামে জঙ্গি মামলা ঠুকে দেওয়ার ঘটনায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে দেশের নিরীহ ধর্মপ্রাণ জনতা। সিটিটিসির সাজানো জঙ্গি নাটক, গুম-ক্রসফায়ারের পুরনো বিভীষিকা আবারও তাড়া শুরু করেছে ইসলামী আলোচক, লেখক ও সামাজিকভাবে পরিচিত জনপ্রিয় আলেমদের।
২০০৮ পরবর্তী আওয়ামী লীগ শাসনামলে রাজনৈতিক বিরোধী, ইসলামপন্থী বা সরকার সমালোচকদেরকে “রাজাকার”, “জঙ্গি” কিংবা “উগ্র মৌলবাদী” হিসেবে চিহ্নিত করে গুম, খুন, কারাবন্দিত্বের মতো পরিণতির মুখে ঠেলে দেওয়া হতো। বিশেষত হেফাজত বা জামায়াত ঘরানার রাজনৈতিক শক্তিগুলোর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ছিল লাগাতার অভিযান। এ সময়ে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা এই ট্যাগিংয়ের পেছনে ভূমিকা রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভারতের সাথে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠতা থাকলেও, বর্তমান সরকার পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। জাতীয় ইস্যুতে মনোযোগী থাকার বদলে এসব দেশের স্বার্থ রক্ষায় “জঙ্গি” বা “চরমপন্থী” ট্যাগ দিয়ে সম্ভাব্য প্রতিবাদকারীদের আগে থেকেই দমন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইসলামিক চিন্তাবিদদের মতে, হাজারো শহিদের রক্তের দায় নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমকামিতা, বিকৃত যৌনাচার ও অবৈধ যৌনপেশার বিস্তারের মাধ্যমে পশ্চিমা এজেন্ডা প্রকাশ পেয়েছে। সেটার বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে বাড়তে থাকা ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে সরকার সম্ভাব্য প্রতিরোধকারীদের ‘ধর্মান্ধ’, ‘উগ্র’ কিংবা ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিচ্ছে। বাস্তবে এসব মানুষের মূল পরিচয় হয়তো কেবল নৈতিক অবস্থান থেকে ভিন্নমত প্রকাশকারী।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের এই ‘ট্যাগিং রাজনীতি’র পেছনে আরও একটি সুপ্ত উদ্দেশ্য থাকতে পারে। সেটা হতে পারে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার অফিস বাংলাদেশে খোলার বিরোধিতার বিষয়টি থেকে জনদৃষ্টি সরিয়ে রাখা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে জাতিসংঘের তথাকথিত মানবাধিকার সংস্থার একটি অফিস খোলার গুঞ্জন রয়েছে, যা মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নজরদারির চেয়ে সমকামিতাসহ অসামাজিক ও অনৈতিক কাজের নোংরা পরিবেশ সৃষ্টির প্রতি বেশি গুরুত্ব দেবে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের ঢাকায় স্থায়ী উপস্থিতি নিয়ে জনমনে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সরকার এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীলদের “উগ্র মব”, “জঙ্গি” ইত্যাদি ট্যাগ দিয়ে দমন-পীড়নের পুরনো খেলা শুরু করছে কিনা, এটাই এখন ধর্মপ্রাণ মানুষদের কাছে উদ্বেগের বিষয়।
সকল ইসলামিক লেখক, গবেষক ও অ্যাক্টিভিস্টরা বিষয়টিকে আগামীর বাংলাদেশে ধর্মীয় মূল্যবোধের জন্য হুমকি হিসেবে গণ্য করেছেন। এই ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দল, মত ও মাসলাকি বিভেদ ভুলে পারস্পরিক ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ ও প্রতিকারের বিষয়ে সবাইকে উৎসাহিত করেছেন।