রেলে ছড়াচ্ছে ইনোভেশন: নেপথ্যে যে তরুণ রেল কর্মকর্তা - দৈনিক সাবাস বাংলাদেশ
নোটিশ:
শিরোনামঃ
রেলে ছড়াচ্ছে ইনোভেশন: নেপথ্যে যে তরুণ রেল কর্মকর্তা কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীতে ৩০০ পিস ইয়াবা ও গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার যুক্তরাজ্যের নর্দাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের ৫৫তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন সিলেট-চট্টগ্রাম ফ্রেন্ডশিপ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এতিমখানায় কার্পেট উপহার প্রদান বুটেক্সে জুলাই কালচারাল সেন্টারের উদ্যোগে ‘সুফরাতুল ইয়াতামা’ বালিয়াকান্দি রিপোর্টার্স ক্লাবের উদ্যোগে ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত কুবির ৭২ শিক্ষার্থী আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত নানিয়ারচর জোন কর্তৃক ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে ঈদ উপহার ও আর্থিক অনুদান প্রদান কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক হলেন সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ রাজবাড়ীতে আলুভর্তি ট্রাক উল্টে নিহত ১

রেলে ছড়াচ্ছে ইনোভেশন: নেপথ্যে যে তরুণ রেল কর্মকর্তা

বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ বার দেখা হয়েছে
নীরবে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। দিন দিন রেলওয়ে কর্মকর্তাদের জনহিতৈষী কর্মকান্ড আসছে আলোচনায়, একটু একটু করে উন্নতি লাভ করছে রেল, ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে উদ্ভাবনের গভীরে।
অথচ বছর কয়েক আগেও রেল ছিল এক সমস্যাক্রান্ত যাত্রীপরিবহন ব্যবস্থা্র নাম। যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি নিয়ে কোনো পরিকল্পনা ছিল না, ছিল না স্বল্পবাজেটে কোনো কিছু করার পরিকল্পনা। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রেলফ্যানরা রেলওয়ে কেন্দ্রিক ফেসবুক গ্রুপগুলোতে রেলকর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নানা অব্যবস্থাপনা ইস্যুতে সমালোচনা করতেন।  দুই একজন সিনিয়র কর্মকর্তা যদি  রেলবদলের কিছু উদ্যোগ গ্রহণও করতেন তাহলেও সেগুলো বিবেচনাপ্রসূত না হওয়ার জন্য বিতর্কই ছড়াত বেশি। যেমন : চীন থেকে শত কোটি টাকায় ক্রয় করা ডেমু ট্রেন চলাচলের কিছুদিন যেতে না যেতেই বিকল হতে থাকে, রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা অপচয় হয়েছে মর্মে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নামে দুদকে করা হয় মামলা। ঢাকা ও রাজশাহীতে বসানো হয় অটোমেটেড ট্রেন ক্লিনার মেশিন, যেটি ব্যবহার করতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনায় পড়ে রেল, অবশেষে কিছুদিন পর বন্ধ হয়ে যায় এটির ব্যবহারও। এরইমধ্যে অচল ডেমু ট্রেনগুলো চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন রেলের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। কিন্তু একটি ডেমু ট্রেন সচল করার কিছুদিন যেতে না যেতেই আবারও বসে যায় ট্রেনটি। এভাবে কোটি কোটি টাকার মেগা মেগা প্রজেক্ট নিয়েও কিছু মানহীন কোচ ও লোকোমোটিভ ক্রয় করে রেল একের পর এক নানা অঘটনের জন্ম দিয়ে জনমনে নেতিবাচক ইমেজ পাকাপোক্ত করে নিয়েছিল। রেল সংক্রান্ত নিউজ বলতেই বোঝানো হত কোনো দুর্নীতি বা দুর্ঘটনার সংবাদ। সেই সময় রেল কর্মকর্তারাও যাত্রাস্থান থেকে একটি ট্রেন ২-৪ ঘন্টা বিলম্বে হলেও  নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলেই এটিকে সাফল্য মনে করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতেন।
কিন্তু ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে রেলে বড় ধরণের একের পর এক উদ্ভাবন করে এবং আন্তর্জাতিক একাধিক পুরষ্কারে ভূষিত হয়ে মিডিয়া সেনসেশনে পরিণত হয়ে প্রথমবারের মতো এই অচলায়তন ভেঙে দেন রেলের তরুণ কর্মকর্তা  প্রকৌশলী মো: তাসরুজ্জামান বাবু।  ৩৫তম বিসিএস এর মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত এই রেলকর্মকর্তা ২০২৩ সালে লালমনিরহাট রেলওয়েতে বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ক্যারেজ এন্ড ওয়াগন) পদে পদায়িত হওয়ার পর তৈরি করেন ভাঙণপ্রতিরোধী দীর্ঘস্থায়ী হুইলসেট গাইড। একে একে তিনি তৈরি করেন ট্রেন উদ্ধার কাজে ব্যবহার্য রি-রেইলিং ইকুইপমেন্ট, শিডিউল মেরামতের জন্য ইলেকট্রিক লিফটিং জ্যাক সহ আরো ছোট-বড় বেশ কিছু উদ্ভাবন। ২০২৪ সালের মাঝামাঝিতে এসে তিনি যে অটোমেটেড রেলওয়ে টার্নটেবিল উদ্ভাবন করেন তা একই সাথে ছিল বাংলাদেশে রেলযোগাযোগের ১৬২ বছরের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি প্রকৌশলী নির্মিত টার্নটেবিল, এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম অটোমেটেড টার্নটেবিল। তার এইসকল উদ্ভাবনের মূল থিম ছিল আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে স্বল্পখরচে ও দেশীয় প্রযুক্তিতে নানামুখী প্রাযুক্তিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের মানোন্নয়ন করা, যা বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও অনুস্মরণীয়। এসব উদ্ভাবনের কারণে ২০২৫ সালে তিনি দেশের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা স্টেভি এওয়ার্ডস এর দুইটি আসরে মোট তিনটি পদক লাভ করেন। স্টেভি এওয়ার্ডস ফর টেকনোলজি এক্সিলেন্স আসরের ট্রান্সপোর্টেশন টেকনোলজি ক্যাটাগরিতে তিনি ফোর্ড ও জেনারেল মোটরস এর মতো বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবকদের হারিয়ে লাইফটাইম এচিভমেন্ট এওয়ার্ড হিসেবে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। এছাড়াও একই ক্যাটাগরিতে বেস্ট এমপ্লয়ি অভ দ্য ইয়ার হিসেবে তিনি জেতেন একটি রৌপ্যপদক। একইবছর এশিয়া-প্যাসিফিক স্টেভি এওয়ার্ডস আসরে তিনি মোস্ট ইনোভেটিভ টেকনোলজি লিডার অভ দ্য ইয়ার হিসেবে জয় করে্ন রৌপ্যপদক, যেখানে তাঁর সহবিজয়ী হিসেবে ছিল গুগল, এমাজন এর মতো প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবকরা। এছাড়াও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউনিডো) থেকে স্বীকৃতিসনদ লাভ করেন তিনি। পাশাপাশি জাতীয়ভাবে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে সেরা উদ্ভাবক ২০২৫ এর পদকও তিনি অর্জন করেন। তাঁর এতসব অর্জনের কারণে দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলো তাকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার করে। ডেইলি স্টার ও মেঘনা গ্রুপের যৌথ আয়োজন ‘আনবাউন্ড হিরোজ’ প্রোগ্রামের আওতায় দেশ থেকে এমন ৬জন অদম্য ব্যক্তিকে বাছাই করা হয়, যারা তাদের কাজের মাধ্যমে দেশকে বদলে দিয়েছেন। এরপর তাদের জীবন ও কর্মের উপর সংক্ষিপ্ত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা হয়। এখানে তিনি মনোনীত হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে তিনি টক অভ দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হন। এরপরই রেলে শুরু উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্ভাবন বিষয়ক তোড়জোড়।
রেলে দীর্ঘদিন ধরে টার্নটেবিল সংকট থাকলেও কালের গর্ভে ব্রিটিশদের নকশা বিলীন হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের প্রস্থানের পর নতুন করে কোনো টার্নটেবিল নির্মাণ তো হয়ইনি, উপরন্তু তাদের নির্মিত ১২টি টার্নটেবিলের মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৮টি, যেগুলিও মাঝেমধ্যে বিকল থাকায় উল্টোমুখী হয়ে ট্রেন চলায় দুর্ঘটনা ঘটে। গত ১৮ মার্চ আন্তঃনগর নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ৯টি বগি উলটে যায় এবং ৬৬ জন যাত্রী আহত হয়। তদন্তে কমিটিতে পাকশী ও খুলনা রেলওয়েতে কোনো টার্নটেবিল না থাকাকে কারণ হিসেবে দাবি করা হয়েছে। একইভাবে ২০২৩ সালের ২৩ আগস্ট এগারসিন্দুর এক্সপ্রেস ট্রেনের দুর্ঘটনায় ২০ জন যাত্রীর মৃত্যু ও ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছিল যেটিরও কারণ ছিল চট্টগ্রামের টার্নটেবিল বিকল থাকা। দীর্ঘদিন ধরে রেলের কোনো প্রকৌশলী বিকল টার্নটেবিলগুলোকে সচল করারও উদ্যোগ নেননি, নতুন কোনো টার্নটেবিল নির্মাণ তো দূরের কথা। জানা যায়, লালমনিরহাটেও একটি ব্রিটিশদের নির্মিত টার্নটেবিল ছিল যা ১৯৯৩ সালে ৩৫ বছর আগে বিলীন হয়ে গেছে। জনাব তাসরুজ্জামান বাবু নিজস্ব প্রযুক্তিতে নিজস্ব ডিজাইনে লালমনিরহাটে যে টার্নটেবিল উদ্ভাবন করেন তা যেন রেলের ব্রিটিশবাহিত হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি অটোমেশনের মাধ্যমে আধুনিকায়নের ছোঁয়ায় বাড়তি সংযোজন। রেলের মহাপরিচালক জনাব আফজাল হোসেন এই বছর ২৩ জানুয়ারি ও জিআইবিআর জনাব ময়নুল হোসেন ২৯ জানুয়ারি লালমনিরহাটে এই টার্নটেবিল সহ অন্যান্য উদ্ভাবন পরিদর্শন করেন এবং এগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন। রেলের মহাপরিচালক জনাব আফজাল হোসেন বলেন, অবিলম্বে তিনি ঢাকা, পাকশী ও খুলনাতে একই নকশা ও কারিগরি প্রযুক্তিতে টার্নটেবিল উদ্ভাবন করবেন। পাকশীর কিছু উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, পাকশী ও খুলনাতে টেন্ডার আহ্বান এর প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে, চলমান এপ্রিল মাসেই ইজিপিতে টেন্ডার ছাড়া হবে।
প্রকৌশলী জনাব তাসরুজ্জামান বাবুর তৈরিকৃত নকশা ও লিপিবদ্ধ কারিগরি প্রযুক্তির সাহায্যেই হতে যাচ্ছে নবনির্মিত টার্নটেবিলগুলি। অর্থাৎ, তাসরুজ্জামান বাবু প্রত্যন্ত লালমনিরহাট থেকে রেলে যে উদ্ভাবনের যাত্রা শুরু করেছিলেন তা ধীরে ধীরে সমগ্র বাংলাদেশ রেলওয়ের চারটি ডিভিশনেই ছড়িয়ে পড়ছে। এখানেই শেষ নয়, তাসরুজ্জামান বাবুর “আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে স্বল্প খরচে, দেশীয় প্রযুক্তিতে” থিমটি এখন যেন রেলের স্লোগানে পরিণত হওয়ার পথে। এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তাসরুজ্জামান বাবু বলেন, “এটা খুবই আনন্দের বিষয় যে আমার উদ্ভাবন ও সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে রেলের সিনিয়র-জুনিয়র অনেক কর্মকর্তাই এখন ইনোভেটিভ কিছু করার কথা ভাবছেন এবং করছেনও।”
বাস্তবেও তাই দেখা গেছে। গত বছর নভেম্বর মাসে রেলের আরেক কর্মকর্তা স্বল্প খরচে, দেশীয় প্রযুক্তিতে রেল লাইন কাটার যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন এবং মিডিয়ায় ইতিবাচক শিরোনাম হয়েছেন। এভাবে আরো কিছু কর্মকর্তা ছোটবড় কিছু উদ্ভাবন করে জনগণের আস্থা অর্জন করছেন এবং রেলের ব্রিটিশ আমলের যাত্রীসেবামুখী ইমেজ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছে।  জনাব তাসরুজ্জামান বাবুই বাংলাদেশ রেলওয়ের স্মরণকালের প্রথম কর্মকর্তা যাকে নিয়ে গণমাধ্যমে ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হয় এবং ধীরে ধীরে তার সম্প্রসারণ হচ্ছে। তাসরুজ্জামান বাবু জানান, তার ভবিষ্যত পরিকল্পনা হলো বাংলাদেশ রেলওয়ের অধীনে একটি পৃথক লাভজনক কোম্পানি গঠনের প্রচেষ্টা করা যার কাজ হবে দেশীয় প্রযুক্তিতে রেলের উন্নতমানের কোচ ও লোকোমোটিভ নির্মাণ করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে রেলকে লসকারী খাত থেকে লাভজনক খাতে পরিণত করা। এছাড়াও ব্রিটিশদের লিগ্যাসিকে ধারণ করে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে রেলে রোবোটিক্সের সূচনা করাও তার একান্ত ইচ্ছা।
তাঁর মতো স্বপ্নবাজ রেলপ্রকৌশলীদের সুযোগ করে দেওয়া হলে বাংলাদেশ রেলওয়ে দেশের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক সেক্টর ও যাত্রীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত হবে বলে আশা করছেন বিশ্লেষকরা।

শেয়ার করুন

Comments are closed.

এই ধরনের আরও নিউজ

© কপিরাইট ২০২৪-২০২৫ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: NagorikIT